ক্যারেক্টার ক্যালিব্রেশন: ‘ট্রোজান হর্স’ হ্যামস্ট্রিং
৯ বছর আগে একটা মনোছবি দেখেছিলাম; ছবিটার খুচরা স্কেচ হচ্ছিল, বিবিধ প্রতিবন্ধকতায় স্কেচ হতে পারছিল না পূর্ণাঙ্গ পেইন্টিং; অবশেষে ২৯ জুলাই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো- বাংলাদেশের সাদা বল ক্রিকেটের অধিনায়ক লিটন দাস!
লিটন ২ ফরম্যাটের ক্যাপ্টেন্সি পাওয়াতে কী কী ঘটেছে?
তার পরিবার এবং ঘনিষ্ঠজনেরা অপরিমিত আনন্দিত, সে নিজে কয়েকটা নতুন কোম্পানির এনডোর্সমেন্ট পেতে পারে, এ মুহূর্তে চলা বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি তারকা সংকটে তার ফ্যানবেইজ তুলনামূলক বড়—- ফলে প্রথম আলো, বিডিনিউজ সহ কতিপয় মিডিয়া হাউজ তার নিউজ ভ্যালু ব্যবহার করবে, ফ্যানরা রিলস শেয়ার করবে, দুটো সিরিজ খারাপ করলে দেব চৌধুরি-নট আউট নোমান-রিয়াসাত আজিম তার নিউজভ্যালুকে নেগেটিভলি ব্যবহার করে কামাবে বাড়তি ভিউ।
আমি এ বলয়ের কোনো ক্যাটেগরিতেই বিলং করি না।
একজন লেখক যখন ক্যারেক্টার ডিজাইন করেন সেখানে আধা বাস্তবতা আধা কল্পনা জুড়ে দেন। ক্যারেক্টারের কার্যবিধি যদি লাইভ ট্র্যাকার দিয়ে প্রতিনিয়ত আপডেট করার সুযোগ থাকত, কেমন হত সমগ্র ব্যাপারটা?
লিটনের সঙ্গে আমার বন্ডিং সংজ্ঞায়নে কেমিস্ট্রির আয়নিক বা সমযোজী বা সিগমা— সকলপ্রকার বন্ধনই স্বীকার করে নেয় অপারগতা৷
বন্ডিং ব্যর্থতার কনটেক্সট থেকেই মনোছবিতে প্রথম তুলির আচড়ের ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরি-
২০১৭ তে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে এওয়ে টেস্টে লিটন যখন ৭০ রানের কুইক ফায়ার ইনিংস খেলেছিল, সেদিন ড্রেসিংরুমে ফিরে তার ভাবনায় কী ছিল তার নিজেরও মনে নেই এতদিন পরে, তবে কট বিহাইন্ড হয়ে যখন বাউন্ডারি পানে হেঁটে যাচ্ছিল, টিভি স্ক্রিনে দেখে সে মুহূর্তেই নোট লিখেছিলাম- ‘নেক্সট ক্যাপ্টেন’!
লিটন দুটো অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছে (২০১২,১৪), অধিনায়কত্ব করেনি কোনোটাতেই। আপাতদৃষ্ট ইন্ট্রোভার্টেড পারসোনালিটির কারণে ক্যাপ্টেন্সির আলোচনাতেও তার নাম থাকত না। বহুদিন বাদে সালাহউদ্দিন মিডিয়াতে বলেছিলেন লিটনের ক্রিকেট ব্রেইন সবচেয়ে ভালো, দারাজ এর এক অনুষ্ঠানে সাকিবকে প্রশ্ন করা হয়েছিল পরবর্তী অধিনায়ক কে হতে পারে, সে ৩টা নাম বলে- লিটন, শান্ত এবং মোসাদ্দেক!
কেন লিটনকে ক্যাপ্টেন চিন্তা করেছিলাম, এর লজিকাল এক্সপ্লেনেশন দিতে পারব না, বেশিরভাগটাই ইনস্টিংট আর ইনট্যুশন তাড়িত।
তবে ২০১৮ তে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ মাঠে বসে দেখাকালীন একটা বোধ আবিষ্কার করি— মাঠের যে কোনো জায়গায় ফিল্ডিং করুক, বহু দূর থেকেও হাঁটা-চলা দেখে সবার মধ্য থেকেও আলাদাভাবে নজরে পড়ে বাংলাদেশে এমন ক্রিকেটার মাত্র ৩ জন- সাকিব, মাশরাফি এবং লিটন!
একেও কোনো রেশনাল ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে কনভিন্সিংলি আর্টিকুলেট করা যাবে না, তাত্ত্বিকরা ‘কগনিটিভ বায়াস’ ট্যাগ দিয়ে বাতিল করতে ২য় বার ভাববে না।
লিটনের ক্যাপ্টেন্সি প্রাপ্তিকে যদি Salvation ধরি, সেই ক্যারেক্টারের জার্নিতে আপনি অনেকগুলো ফিল্ম পাবেন- হরর, তেলুগু, মালায়লাম, ডার্ক কমেডি।
তার ক্যাপ্টেন্সি অভিষেকই তো হরর ফিল্মের স্ক্রিপ্ট। ২০২১ এ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি২০ সিরিজের ৩য় ম্যাচে ইনজুরড মাহমুদুল্লাহ এর জায়গায় টস করার দায়িত্ব পায়। বৃষ্টির কারণে ম্যাচ নেমে আসে ১০ ওভারে, চেজ করতে হবে ১৪০+, লিটন মারে গোল্ডেন ডাক!
কিছুদিন পরে হওয়া বিশ্বকাপে শোচনীয় পারফর্মই শুধু করে না, দুটো লোপ্পা ক্যাচ ড্রপ করে শ্রীলংকার বিপক্ষে ম্যাচ হারানোতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। বিশ্বকাপ চলাকালীন অনেকগুলো ফেসবুক পেজ তার রানের উপর ডিসকাউন্ট অফার ঘোষণা করে। বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারের জন্য এমন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কালেক্টিভ হিউমিলিয়েশনের একমাত্র দৃষ্টান্ত আজ অবধি এটাই।
হরর থেকে আমরা যাই মালায়লাম ফিল্মে, অনেকটা ‘উস্তাদ হোটেল’ ঘরানার।
একজন ক্রিকেটারের জন্য ম্যাগনাম ওপাস বলতে যা বুঝায়, লিটনের জন্য সেটা ছিল ২০২২ সাল। কয়েকটা ফ্যাক্ট বলি
-সে বছর লিটন সব ফরম্যাট মিলে রান করেছিল ১৬৯৩, যা বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এখনো পর্যন্ত এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। এমনকি সে বছর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটেই ২য় সর্বোচ্চ রান ছিল তার।
-টেস্টে ৭২৪ রেটিং পয়েন্ট তুলে র্যাংকিংয়ে ১২ নম্বর পজিশনে আসে, যা বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের সর্বোচ্চ রেটিং
-আফগানিস্তানকে ওয়ানডেতে সিরিজ হারিয়ে প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ পুরস্কার
-নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফলো অনে পড়ে সেখান থেকে সেঞ্চুরি, বছরের শেষাংশে শ্রীলংকার বিপক্ষে ২৪/৫ থেকে সেঞ্চুরি।
-টেস্টের ভাইস ক্যাপ্টেন্সি পায়। ওয়ানডেতে কোনো সুনির্দিষ্ট ভাইস ক্যাপ্টেন না থাকলেও অলিখিতভাবে সেটা যে লিটন তার প্রমাণ পাই বছরের শেষভাগে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ তামিম মিস করায় লিটনই করে ক্যাপ্টেন্সি। ফুটবল বিশ্বকাপের ডামাডোলে ভারতকে হারানোটা এক্সপোজার পায়নি তেমন!
-টি২০ ওয়ার্ল্ডকাপে ভারতের বিপক্ষে ২৭ বলে ৬০ রানের সেই ইনিংস, যদিও সেখানেও তাকে থামিয়ে দিয়েছিল বৃষ্টি
৭২৪ রেটিং প্রাপ্তি উপলক্ষে ২০২২ এর জুনে একটা পুঁথি রচনা করি। লিটনের ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচে নাজমুল আবেদিন ফাহিমের স্ট্যাটাস, সাম্প্রদায়িক আক্রমণের শিকার হওয়া, ইউটিউবারদের নোংরামি, ২০২১ বিশ্বকাপের পরে দল থেকে বাদ পড়ার পরে চ্যানেল একাত্তরে নিউজ করেছিল সে চিরতরে বাদ, পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪৯/৪ থেকে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, তার গুণমুগ্ধ শেখ মিনহাজের ক্রমাগত ট্রলড হওয়া— অর্থাৎ তার পেইন এবং গেইন সমগ্র ডকুমেন্টেড করেছিলাম।
আমার তৎকালীন ম্যানেজার নাঈম শেখকে দিয়ে গাওয়াই। যেদিন আপলোড করি, সীতাকুন্ডে কন্টেইনার বিস্ফোরণে লাশের অরণ্য তৈরি হয়। সেই শ্মশানস্তব্ধতায় নাঈম শেখের গায়কি হয়ে যায় ইটে চাপা পড়া ঘাস। আমাদের ফিল্মোগ্রাফির ক্রনোলজিকাল সিকুয়েন্সিংয়ে পুনারাবির্ভূত হোক সে পুঁথিটাও
আমরা যখন ফিল্ম দেখি, স্টোরিলাইন ফ্ল্যাটলি এগুলো তাকে লাগে ঘুঘুঘর, দর্শককে ধরে রাখে ক্লাইম্যাক্স এবং টেনশন।
লিটনের ক্যারেক্টার ডিজাইনেও ২০২২ এর পরে একটা ২০২৩ লাগত। যে কারণে বছরের শুরুতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩ ম্যাচের সিরিজে দুটোতেই ডাক!
আফগানিস্তান সিরিজে ১ম ম্যাচের পরই তেলুগু সিনেমার টুইস্ট।
আচমকা অবসর নিল তামিম ইকবাল (যদিও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার), ২য় ম্যাচের আগে প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের সব জিজ্ঞাসা শুধুমাত্র তামিম কেন্দ্রিক, কারণ ওতেই ক্লিকবেইট বেশি। মিডিয়ানবিশ লিটনের সে বোধ তৈরি হয়নি তখনো, তাই সে বলে বসে- ‘এসব প্রশ্নের সাথে কালকের খেলার কী সম্পর্ক; আমি লিটন দাস তাহলে চলে যাই, কোচ বা বোর্ড প্রেসিডেন্ট আসুক’
সঙ্গত কারণেই এ উত্তরে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল বেশ। অবসর থেকে ফিরে তামিম একটামাত্র ম্যাচই খেলেছিল পরবর্তীতে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, সে সিরিজেও প্রথম ২ ম্যাচে ক্যাপ্টেন লিটন, ৩য় ম্যাচে বিশ্রাম, এবং ক্যাপ্টেন্সি স্পটে আগমন শান্তর৷ বিশ্বকাপের আগে সরিয়ে দেয়া হলো ভাইস ক্যাপ্টেন্সি থেকে।
বিশ্বকাপ চলাকালে টিম হোটেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে ইস্যু ঘটলো, যার ফলশ্রুতে মিডিয়া ব্যাকল্যাশ যে লেভেলে পৌঁছুলো, তাকে সরি বলতে হলো। বিশ্বকাপের মাঝখানে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের আগে দেশে ফিরেছিল কয়েকদিনের জন্য, ফ্যামিলি ইমার্জেন্সিতে৷ সমালোচনা হয়েছে সে ইস্যুতেও৷
বিশ্বকাপে কেমন ছিল তার পারফরম্যান্স?
বাংলাদেশের ৯ ম্যাচের ৫টাই মাঠে বসে দেখেছি। ধর্মশালায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ইনিংসটা তীব্র ডমিনেটিং, ইন্ডিয়া-পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইনিংস অনেকটুকু টেনে নিয়ে ক্রুশিয়াল সময়ে আউট হয়েছে। বাংলাদেশের জেতা ২ ম্যাচে পারফরম্যান্স নেই (ইন্টারেস্টিংলি, ৩ নম্বরে নামা শান্ত ৯ ম্যাচের ৬টাতে সিঙ্গেল ডিজিটে আউট হলেও জেতা ম্যাচ দুটোতে ছিল ফিফটি)
তবু ২৮০+ রান তুলেছিল, যা এখনো পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি ওপেনারের সেরা সাফল্য৷
লিটনের ক্যারেক্টার আর্কে আমরা এবার ২য় লেয়ারের ক্রাইসিস ইনজেক্ট করি৷
বিশ্বকাপের পরে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড সিরিজ। পিতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করে। বোর্ডের চাওয়া ছিল অন্তত প্রথম টেস্টটা খেলুক, সে সম্মত হয় না।
এথলেটরা যেহেতু লক্ষ-কোটি মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে, রাষ্ট্রীয়ভাবেও সর্বোৎকৃষ্ট প্রটোকল পায়— তারা কাঠামোবদ্ধ জীবনপ্রণালির মানুষের মতো আচরণ করে বসলে সেখানে ডেডিকেশনের প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশেষত বাংলাদেশে– যেখানে ক্রিকেটাররা ফিল্মস্টার বা রকস্টারদের চাইতেও জনপ্রিয়।
তার কিছুদিন পরে নট আউট নোমান চ্যানেলে একটি কনটেন্ট প্রকাশিত হয় যার মূল বক্তব্য- বাংলাদেশ ক্রিকেটের লিডারশিপ ভাবনায় আর নেই লিটন দাস!
লিটনের সঙ্গে সরাসরি মেশা হয়নি কখনো, তবে তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে অনুমান করি- সে খেয়ালি প্রকৃতির, বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ক্যাজুয়াল, খেলা নিয়ে ডেসপারেটনেস নেই তেমন। এটা যে মিসরিডিং এতদিনে ক্রিকেটসংশ্লিষ্টরা কনফেস করবে হয়ত; কনফেসনটা আরেকটু আগে এলে সে মেন্টালি বেটার শেপে থাকতে পারত। সে যেহেতু রিদম নির্ভর মানুষ, তার মন ভালো থাকা বা না থাকা বিশাল ম্যাটার্য।
ভাইস ক্যাপ্টেন থেকে নো-বডি হওয়াটা সে কোনোভাবেই নিতে পারেনি, যার প্রতিফলন চোখে পড়ে ২০২৪ এ শ্রীলংকা সিরিজে। টানা ২ ম্যাচে ডাক, ৩য় ম্যাচের দল থেকে শুধু বাদই নয়, একদিনের নোটিশে প্রিমিয়ার লীগ খেলতে পাঠানো— মাত্র ১ ম্যাচের জন্য।
সবাই মনে রেখেছে ওয়ানডেতে ডাক মারাটা, আমি এর চাইতেও ভয়ংকর এক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করেছিলাম টেস্ট সিরিজে। শেষ বেলায় ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথম বলেই ডাউন দ্য উইকেটে এসে তেড়েফুড়ে মারতে গিয়ে আউট। যারা ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে ক্রিকেট দেখেন, তারা এর চাইতে কদর্য আউট দেখেছেন, বিশ্বাস করি না।
লিটনও সেদিন আরেকজন সাব্বির হয়ে যেতে পারত পার্মানেন্টলি, যদি নুরুল সোহান-জাকের আলি-মাহিদুল অংকনদের টপ লেভেলে খেলার মতো ৩০% যোগ্যতাও থাকত!
প্রোটাগনিস্টরা যেমন দৈবের সহায়তা পেয়ে বেঁচে যায়, নায়ককে বাঁচাতে গুলিতে মরে সাইড নায়ক বা নায়িকা, সোহান বা জাকেরদের অযোগ্যতা এখানে সেই দৈবের প্রতিনিধি।
জাকেরকে প্রমোট করবার চেষ্টায় ত্রুটি ছিল না, ফলে স্ক্রিপ্টে প্রথমবার তার লার্জার দ্যান লাইফ হওয়ার সিকুয়েন্স। অনেকটা জাওয়ান মুভির শাহরুখ খান।।
জুলাই অভ্যুত্থানে সাকিব-মাশরাফি-তামিমকে উছিলা বানিয়ে একটি অপশক্তি ক্রিকেট ব্যাশিং ক্যাম্পেইন শুরু করে। সে সময়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে এওয়ে সিরিজ। ২৬/৬ থেকে সেঞ্চুরি, বাংলাদেশ হারিয়ে দিল পাকিস্তানকে। ইমপ্যাক্ট বিবেচনায় বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসেরই সেরা ইনিংস বললে আপত্তি করার মানুষ শতের কম থাকার কথা।
নায়ক হওয়ার সুযোগ এসেছিল এশিয়া কাপ ফাইনালে; হয়নি।
২০১৯ বিশ্বকাপে ৩২২ চেজ করা ম্যাচ বাংলাদেশ প্রায় ১০ ওভার হাতে রেখে জিতবে– এটা কি মাশরাফি বা প্রেসিডেন্ট পাপনের কল্পনায় ছিল? নাহ। লিটনের ৬৯ বলে ৯৪ রানের ইনিংস এক্ষেত্রে এক্স-ফ্যাক্টর হয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের পোস্টার বয় সাকিব যদি সেঞ্চুরি করে ফেলে সেখানে এ ইনিংস কেবলমাত্র তাদেরই স্পেশাল মনে হবে যারা লিটন দাসকে ব্র্যাকেটের বাইরে রাখি৷ তার মোনালিসা ট্যাগ যা প্রশংসা এবং উপহাস দু অর্থেই ব্যবহৃত হয়, সেটিরও সূচনা এ ম্যাচেই!
এবার ক্রিস্টোফার নোলানের ফিল্মিং হোক।
একজন ব্যাটসম্যান ৮ ইনিংসে ১৩ রান করলে তাকে কী করা উচিত?
ইউটিউবাররা বলবে বাদ দাও। যদি আপনি হন নির্বাচক, আপনাকে দুটো বিষয় মাথায় রাখতে হবে
-আপনার এভেইলেবল অপশন কারা
-ওই প্লেয়ারের ট্র্যাকরেকর্ড।। টেস্ট এবং টি২০ এর মতো স্পেশালাইজড স্কিলের ফরম্যাটে যে প্লেয়ার রান পায়, ওয়ানডের মতো তুলনামূলক সহজ খেলায় স্ট্রাগল করলে তাকে একাদশ থেকে ড্রপ করুন। যদি বাদই দেন, তার ফেরাটা কঠিন করুন যাতে নিজের সিদ্ধান্তটা জাস্টিফাইড হয়।
লিটনকে যখন ওয়ানডে দল থেকে ছাঁটাই করা হয়, সেদিনই নির্বাচক লিপুকে ফাটাকেস্ট আখ্যা দিয়ে লিখেছিলাম সে আধুনিক ক্রিকেট সম্পর্কে কোনো জ্ঞান রাখে না। এই যে লিটন ওয়ানডেতে আবার ফিরলো, ঠিক কোন পারফরম্যান্সে? ফলে বাদ দেয়া এবং পুনরায় ডাকা— দুটো সিদ্ধান্তই পপুলিস্ট এবং শিশুতোষ; এটা ইঙ্গিত করে দেশের ক্রিকেট কাঠামো, পাইপলাইন, কালচার— এসব থেকে আপনি বহুদূরে! মধ্যিখানে মেন্টাল হেলথ ক্ষতিগ্রস্ত হলো লিটনের৷
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির দল থেকে বাদ পড়ার পরে গাঙ্গুয়া নামক জনৈক ব্যক্তি এমনও রায় দিয়েছিল ২০২৫ এর পরে লিটনের কোনো নিশানাও থাকবে না বাংলাদেশ ক্রিকেটে; তার সাথে বাজি ছিল লিটন ফিরবে তো বটেই,২০২৭ বিশ্বকাপের ক্যাপ্টেন্সিও পেতে পারে; এদেশে গণরায় ঘুরতে লাগে একটামাত্র ক্রাঞ্চ ম্যাচ জেতানো। ২ রানে থাকা অবস্থায় কোনো জেনুইন ব্যাটসম্যান টেল এন্ডারদের সাথে নিয়ে ব্যাট করে সেঞ্চুরি পেয়েছে—- ক্রিকেট ইতিহাসেই এ ঘটনা অশ্রুতপূর্ব!
যেহেতু নোলানের ফিল্ম, আমাদের ক্যারেক্টার আর্কে যুক্ত হবে কতিপয় অনালোকিত সাব-প্লট
-লিটন যখন ইউটিউবার এবং মিডিয়াজীবীদের দ্বারা ডিমিনড হত— অর্থাৎ ভালো পারফর্ম করলে আলাপ কম, কিন্তু আন্ডারপারফরমকে হাইলাইট করা— ফেসবুকে অসংখ্যবার লিখেছি তার ক্যারিয়ার লম্বায়িত করতে হলে পিআর এ মনোযোগী হতে হবে। পারফরম্যান্স কার্ভ যখন নিম্নমুখী থাকবে তখন পিআর কাজ করবে ব্যাক আপ ফোর্স হিসেবে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ তামিম ইকবাল। সাকিবের ‘বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার’ এর বিপরীতে তাকে ব্রান্ডিং করা হত ‘দেশসেরা ওপেনার’! লিটন এখন প্রচুর ইন্টারভিউ দিচ্ছে, পডকাস্টে অংশ নিচ্ছে, বিভিন্ন কর্পোরেট প্রোগ্রামে যায়, ফেসবুকে তার অসংখ্য রিলস— সবকিছু ইঙ্গিত করে পিআর স্ট্র্যাটেজি সে রপ্ত করতে পেরেছে, সময় আর দুর্যোগ সে ম্যাচিউরিটির দিয়েছে দীক্ষা!
– লিটনের সত্যিকারের একিলিস হিল হলো হ্যামস্ট্রিং। তার ক্যারিয়ারে যতবার ইঞ্জুরি হয়েছে তার মধ্যে ২০১৭ তে শ্রীলংকা সফরে পাঁজরের হাড় ভাঙ্গা, ২০২১ এ কব্জিতে সমস্যা, সর্বশেষ এশিয়া কাপে পাঁজরে চিড় ধরা— এ ৩ কেইস ব্যতীত সকল ইনজুরিই কোনো না কোনোভাবে হ্যামস্ট্রিং রিলেটেড৷ তার বেশিরভাগ বড় ইনিংসেই একাধিকবার ট্রিটমেন্ট নিতে হয়, সেও হ্যামস্ট্রিংয়েরই। ২০২২ জিম্বাবুয়ে সফরে একটা সেঞ্চুরি মিস হয়েছে এ কারণে; ৮২ তে থাকা অবস্থায় মাঠ থেকে উঠে যেতে হয়, সিরিজ থেকেই রুলড আউট। এখনো সে বয়ে বেড়াচ্ছে অদ্ভুতুড়ে এক ইনজুরি, যার খেসারত দিতে হলো অস্ট্রেলিয়ায় ১ম টেস্ট খেলতে না পারার আক্ষেপে!
– লিটন তার অসংখ্য ইন্টারভিউতে মিরপুরের মাঠকে ডিসগ্রেসফুল বলেছে। ২০১৫ থেকে এখানে ওয়ানডে খেলতে খেলতে খেলতে খেলতে…….. তার প্রথম ফিফটি পেতে হলো ২০২৬ এ এসে!
-ক্যারিয়ারে ডিসিপ্লিনারি ইস্যুতে কখনোই সমস্যা না হলেও অতি সম্প্রতি কোড অব কন্ডাক্ট ভঙ্গ করায় আর্থিক শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে৷ তাকে শাস্তি দিয়েছে সেই প্রেসিডেন্ট, খেলোয়াড়ি জীবনে যে নিজে এবং তার এককালের বেস্ট ফ্রেন্ড মিলে বিসিবিকে রূপ দিয়েছিল নাট্যশালায়, যেখানে স্টারডমের কাছে কোড অব কনডাক্টের অসহায় আত্মসমর্পণ! তামিমের চরিত্রের এ দিকটা দারুণ মিস্টিকাল। খেলোয়াড় হিসেবে নিয়মকে বলেছে কলাগাছ, প্রশাসক হিসেবে নীতি নিয়েছে ‘ডিসিপ্লিন ফার্স্ট’। আমার প্রয়াত নানী বলতেন- ‘সব বউই একদিন শাশুরি হয়’
-সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা তুলবার লালসায় টি২০ বিশ্বকাপ বর্জন করেছে বাংলাদেশ— এটা এখন প্রমাণিত ফ্যাক্ট। দলটা খেললে তার অধিনায়কত্ব যে করত, যথারীতি এখানেও দুর্ভাগ্য তাকে মাইলস্টোনবঞ্চিত করলো!
এবার তথাকথিত আর্টফিল্মের দিকে হাঁটি।
ক্যাপ্টেন হিসেবে লিটনের ফিলোসফি সবচাইতে ভালো ম্যাচ করে নিউজিল্যান্ডের স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের সাথে। ফ্লেমিংয়ের দলে খুব এক্সপ্লোসিভ প্লেয়ার ছিল না তেমন, লিমিটেড রিসোর্সকেই সে বেস্ট ইউটিলাইজ করতে চেষ্টা করত, রেজাল্টও আসত। এবং কৌশলের দিক থেকে মিলে সাকিব। সে খেলাকে শেষ ওভার পর্যন্ত টানে না; উইকেট তুলবার জন্য সবরকম রিস্ক নেয় এবং আনকনভেনশনাল ফিল্ড প্লেসমেন্ট করে৷ এতে রেজাল্ট পক্ষে আসে, অনেকসময়ই বিপক্ষে যায়। শান্ত-মিরাজ-মুশফিক-রিয়াদ-মমিনুল-সোহান-তাওহিদ হৃদয় প্রত্যেকে ওল্ড স্কুল ক্যাপ্টেন, মাশরাফি পুরোপুরি ইনট্যুশন নির্ভর, তামিম এগ্রেসিভ এবং এটাকিং; ইনোভেটিভ এবং ইমপ্রোভাইজিং মাইন্ডসেটের ক্যাপ্টেন বললে সাকিব আর লিটনকেই খুঁজে পাই। লিমিটেড রিসোর্স দিয়ে ক্রুশিয়াল ম্যাচ বের করে আনতে এ ধারাটিই ইফেক্টিভ।
লিটনের ওয়ানডে দলের সমস্যা দুটো
-ব্যাটিং ভালনারেবল
-স্পিনের ২০ ওভার প্রতিপক্ষের জন্য বোনাস৷ যে কারণে পেসাররা ব্রেকথ্রু এনে দিলেও স্পিনারদের কল্যাণে প্রতিবার প্রেসার হাতছাড়া হয়ে যায়৷ রিশাদ এবং মিরাজ দুজনই ওয়ানডেতে নির্বিষ অপশন৷ নাঈম হাসানের হাইট এবং টার্ন বাউন্স কাজে লাগানোর চেষ্টা করা যায়, কিংবা বাঁহাতি রাকিবুলও এটাকিং অপশন।
ব্যাটিংয়ের একটা ক্লাসিকাল সমস্যা ওভারলুক করা হচ্ছে৷ টপ অর্ডারে ৩ জন বাঁহাতি, এরপরে সব ডানহাতি ব্যাটসম্যান। সৌম্য এবং তানজিদ দুজনই ওয়ান ডিরেকশনাল ব্যাটসম্যান। একজন প্রোপার ব্যাকআপ ওপেনার প্রয়োজন। শান্ত টেস্টে সেসব ইনিংসেই রান পায় যেদিন ওপেনাররা ১০ ওভার পার করে দিয়ে আসে। স্পিনের বিপক্ষে তার এটাকিং শট প্রচুর। এমনকি তার সর্বশেষ সেঞ্চুরিও ৪ নম্বরে। আমি চাইব লিটন আর শান্ত পজিশন এক্সচেঞ্জ করুক।
তাওহিদ হৃদয় সেলফিশ প্রকৃতির ব্যাটসম্যান। তার প্লেয়িং স্টাইল নিয়ে ফিডব্যাক দেয়ার সময় এসে গেছে। আমাদের ৬ এবং ৭ নম্বরে দুজন ব্যাটিং অলরাউন্ডার খেলাতে হবে যারা স্পিন হিটার নয়, পেস বলেও এটাকিং শট খেলতে পারে৷ মোসাদ্দেক এশিয়ান কন্ডিশনে চলনসই হলেও আফ্রিকান কন্ডিশনে কতটুকু কন্ট্রিবিউট করতে পারবে সন্দিহান৷
এতগুলো গ্যাপ পূরণে লিটন কোন প্রক্রিয়ায় সমাধান চিন্তা করে— ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের এ পর্যায়ে আমরা এদিকটাতে নজর দিব।
সর্বশেষ থাকলো ফ্যান্টাসি ফিল্ম।
২০৩১ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক বাংলাদেশ। আমি পুনরায় মনোছবি দেখছি— অধিনায়কদের প্রেস মিট আপ হচ্ছে, বাংলাদেশের হয়ে কথা বলছে লিটন দাস!
এ মনোছবির সাথে বাস্তবতার যোগসূত্র স্থাপনের মাঝখানে ট্রোজান হর্স হয়ে রইলো হ্যামস্ট্রিং!
লিটন ক্যাপ্টেন্সি পাওয়াতে আমার ব্যক্তিগত কোনো প্রাপ্তিযোগ ঘটেনি। তবে নিজের কল্পনা মিলবার প্লেজারে দুই অনুচরকে ভোজন করাব মেক্সিকান নাচোস!
হে লিটন, H এ Honor হয়, Hamstring ও হয়; তোমার হ্যামস্ট্রিং হোক নরওয়ের এরলিং হালান্ড!





