১৯৯৯ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচটা ঐতিহাসিক; বিশ্বকাপে প্রথম জয় বলে নয়, ২৬ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলার কারণেও নয়, একজন ফ্যান অতি উত্তেজনায় হার্ট এটাকে প্রয়াত হয়, সে জন্যেও নয়। তাহলে?
সে ম্যাচের প্লেয়িং ইলেভেনের সদস্যরা ২৭ বছর পরে বাংলাদেশের সোশিও-কালচারাল কনটেক্সট এ যেভাবে বিচরণ করলেন, তা ক্রিকেটের উর্ধ্বে অভাবিত এক রিয়েলিটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে আমাদের৷
রায়হান রাফি চাইলে সেই ম্যাচের প্লেয়িং ইলেভেন থেকে ম্যাগনিফিসেন্ট এক ফিল্ম নির্মাণ করতে পারে; সেটা ব্লকবাস্টার হিটও হতে পারে। শুধু ক্যারেক্টারের নাম আর ঘটনাগুলো একটু-আধটু পরিমার্জনা করে নিলেই হবে!
ক্যারেক্টারগুলোর গল্প বলি ধাপে ধাপে
ইনিংসের প্রথম বলটি খেলেছিল খালেদ মাসুদ পাইলট। এটাই তার ক্যারিয়ারে একমাত্র ওপেন করার ঘটনা। আগের ২ ম্যাচে ওপেনার বিদ্যুৎ ছিল ফ্লপ, আইসিসি ট্রফিতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩ এ নেমে ৭০ করার পূর্ব রেকর্ডের জেরে প্রমোশন পান পাইলট। বাংলাদেশের সবচাইতে কলংকিত বিশ্বকাপ ২০০৩; নবাগত কানাডার বিপক্ষে হারে। সাউথ আফ্রিকায় বসেছিল আসর, ম্যাচ চলেছিল গভীর রাত অবধি, পরদিনই ঈদ। শেষ ম্যাচে কেনিয়ার বিপক্ষেও পরাজয়৷ বাংলাদেশের ফিল্ডিং দেখে ফিশি মনে হচ্ছিল৷ পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়৷ হোটেলে নারী আনা সহ নানাবিধ অভিযোগ পাওয়া যায় অধিনায়কের বিপক্ষে, এবং কমিটি সুপারিশ করে সেই অধিনায়ককে যেন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে কোনো ধরনের দায়িত্ব না দেয়া হয়। গুণধর সে অধিনায়কই পাইলট।
২০১৩ তে আশরাফুল যখন ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অপরাধে নিষিদ্ধ হয়, প্রথম আলোতে তার সহযোগি হিসেবে আরো ৩ বিখ্যাত ক্রিকেটারের নাম ও ছবি প্রকাশিত হয়, যারা ২০০৪ সালে বাংলাদেশের ১০০তম ওয়ানডের আগে তাকে জুয়ারিদের সাথে প্রথম আলাপ করিয়ে দেয়- রফিক, সুজন এবং পাইলট! আমরা এরপর তাকে দেখি ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমির সাথে জড়িত হতে, টকশো তে বিসিবির সমালোচনায় মুখরিত থাকতে, ইউনুস শাসনামলে জামাত-এনসিপির আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে বিসিবির ডিরেক্টর হয়ে যেতে!
সাবাশ পাইলট!
ওপেনে পাইলটের সঙ্গী মেহরাব হোসেন অপি। আগের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ফিফটি করে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ফিফটির রেকর্ড গড়েছেন। বিশ্বকাপের আগে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে প্রথম বাংলাদেশি ইন্টারন্যাশনাল সেঞ্চুরিয়ন হয়েছেন৷ পরের বছর টেস্ট স্ট্যাটাস পায়, অভিষেক টেস্টে ওপেন করেন, প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন।
ক্যারেক্টার হিসেবে বোরিং? একটু পশ্চাতে ফিরি। ঘরোয়া লীগের ম্যাচে ভারতীয় ক্রিকেটার রমন লাম্বা ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ফিল্ডিংকালীন মাথায় আঘাত পান, ২ দিন পরে মারা যান, ব্যাটসম্যান ছিলেন অপি! সেই ট্রাজেডি আজও টাটকা।
টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পরে অপির ক্যারিয়ার লম্বায়িত হয়নি তেমন। মাঠের বাইরের নানা বিতর্কই বেশি এসেছে আলোচনায়। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচ, বয়সভিত্তিক দলের নির্বাচক হন। ২০২৪ বিপিএল আসরে রাজশাহী ফ্র্যাঞ্চাইজি খেলোয়াড়দের পেমেন্ট দিতে গড়িমসি করে, খেলোয়াড়রা প্রতিবাদমূলক কর্মকান্ড করে, ফ্র্যাঞ্চাইজিটির বিরুদ্ধে ব্যাপক ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ উঠে। তার ম্যানেজার ছিলেন অপি!
৩ নম্বরে নামেন ফারুক আহমেদ৷ ২০ বলে ৭ রান তুলে ইনসাইড এজড এ হন বোল্ড আউট। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পরের ম্যাচটাই ফারুকের ইন্টারন্যাশনাল ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। ২০০১ এ বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে নির্বাচকের দায়িত্ব পান। নাজমুল হাসান পাপনের বোর্ডেও ছিলেন নির্বাচক। কোচ হাতুড়িসিংহের সাথে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়ান। একসময় পদত্যাগ করেন। এরপর পরিণত হন টকশো স্টারে৷ বাংলাদেশের ক্রিকেট কতটা খারাপ চলছে, কীরকম দুর্নীতি হচ্ছে- সেসব প্রশ্ন তুলে ক্রিকেটের বিবেক হয়ে উঠেন। ৫ আগস্টের পরে পাপনকে সরিয়ে তাকে বিসিবি প্রেসিডেন্ট বানানো হয়।
দায়িত্ব নেয়ামাত্রই হাথুরুকে বিদায় দেয়ার ঘোষণা দেন। সে মাসেই পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ, অপ্রত্যাশিতভাবে পাকিস্তানের গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ ২-০ তে সিরিজ জিতে। হাথুরুকে সরানো আটকে যায়। পরের মাসে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ হেরে আসে, আড়াই কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে হলেও শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইগোবশত হাথুরুকে সরিয়ে দেন। বিপিএলে রাজশাহী ফ্র্যাঞ্চাইজি বাছাইয়ে ব্যাপক অনিয়মের আশ্রয় নেন। ইতোমধ্যে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত শুরু হয়, আকরাম খান এবং অন্য একজন ব্যতীত বোর্ডের সকল পরিচালক তার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনে, বরখাস্ত হন। আইসিসিতে যাওয়ার হুমকি দেন, টিভি মিডিয়ায় নাজমুল আবেদিন ফাহিম সহ অন্য কয়েকজনের নামে বিষোদগার করেন। কয়েক মাস পরেই বিসিবিতে ফিরে আসেন প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে! সেই ম্যাচে ফারুক যেভাবে ইনলসাইড এজড হয়েছিলেন, তার পদচ্যুতি, প্রত্যাবর্তন এবং পুন:পদচ্যুতির মধ্যে কী নিদারুণ মিল!
আমার প্রিয় সংখ্যা ৭, সেদিন এ পজিশনে নেমেছিলেন আমার এলাকাতো ভাই দুর্জয়। অভিষেক টেস্টের অধিনায়ক। ৬ উইকেট পান। সন্দেহজনক বোলিং একশনের কারণে রিপোর্টেড হন, একশন শুধরে ফিরবার পরে বোলিং কার্যকারিতা হারায়। ইতোমধ্যে আওয়ামিলীগ নির্বাচনে হারে, তারা পারিবারিকভাবেই আওয়ামি রাজনীতির সাথে জড়িত৷ বিএনপি আমলের নির্বাচক ছিলেন মানু নামের এক ব্যক্তি, মিডিয়াতে মন্তব্য করেছিলেন- ‘ও (দুর্জয়) শুধু হাত ঘুরিয়ে বল ছুড়ে দিচ্ছে’, এ মন্তব্য নিন্দিত হলেও সে বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার যে একই সাথে অধিনায়কত্ব হারান এবং দল থেকেও বাদ পড়েন। এরপরে মাত্র এক টেস্টের জন্য ডাক পেয়েছিলেন৷ বসুন্ধরা গ্রুপের সাথে আত্মীয়তা এবং লীগ ব্যাকগ্রাউন্ড মিলিয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা তাকে এম্পি হিসেবে দেখতে পাই। মানিকগঞ্জে নির্বিচারে দুর্নীতি চালান, বিসিবিতেও পরিচালক হিসেবে ঢুকেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তার এক চাচা মারামারিতে নিহত হন। ৫ আগস্টের পরে গ্রেফতার হয়ে দুর্জয়ের বর্তমান ঠিকানা- কারাগার!
বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে ছিলেন এনামুল হক মনি। বাংলাদেশের হয়ে কয়েকটা টেস্ট খেলেছেন, পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ম্যাচে আম্পায়ারিং করেন।
এ ক্যারেক্টার ফিল্মে কী করবে?
ফিল্মে মনি হবেন এক্স-ফ্যাক্টর, যেখানে ক্রিকেট নয় তাকে বিশিষ্টতা দিবে কুমিল্লা জেলা এবং ছোট বোন মিতু। তারুণ্যে মিতু নিজের চাইতে বয়সে ছোট এক ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, একদিন প্রেমের টানে ঘর থেকে পালায়। সেই ছেলেটি একসময় গানের জগতে বেশ নাম-ডাক কামায়, তার ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ অডিও এলবাম শুধু বৈধভাবেই বিক্রি হয় ৬৫ লাখ কপি, পাইরেটেড হয় কয়েক গুণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে অলটাইম হিটের রেকর্ড। সেই গায়কের ‘বেশ বেশ সাবাশ বাংলাদেশ’ গানটা বাংলাদেশ কোনো ম্যাচ জিতলেই বাজানো হত। কিন্তু কথা-বার্তা এবং আচরণের কারণে প্রতিনিয়ত বিতর্কিত হতেই থাকেন। শফিক তুহিন আর প্রীতম আহমেদ নামের দুই শিল্পীর সঙ্গে বিবাদ এতটাই প্রকট হয় যে তা মামলা পর্যন্ত গড়ায়, তাকে জেলেও যেতে হয়। কীভাবে যেন সেও একসময় ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক হয়, এবং ফুটবল মাঠ বিষয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেন। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর সাথে কথার লড়াইয়ে জড়ান।
ইন্টারভ্যালে যাওয়ার আগে আসবে আরেক ক্যারেক্টার।
স্কটল্যান্ডের গেভিন হ্যামিল্টন নামে এক প্লেয়ারের ব্যাপারে আগে থেকেই পত্রিকাতে লেখালিখি চলছিল খুব। পরবর্তীতে সে ইংল্যান্ড দলেও চান্স পেয়েছিল। হ্যামিল্টন ম্যাচটা জিতিয়ে দিচ্ছিল প্রায়। বাঁহাতি পেসার মঞ্জুরুল ইসলামের বলে ব্যাটসম্যান স্ট্রেইট ড্রাইভ করেন, মঞ্জু ঝাঁপিয়ে পড়েও থামাতে পারেনি বলটা, কিন্তু ভাগ্য ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। বল হিট করে ননস্ট্রাইকিং প্রান্তের স্ট্যাম্পে, হ্যামিল্টনের ব্যাট তখন বাতাসে ভেসে গাইছিল-‘হাওয়া হাওয়া এ হাওয়া, খুশবু লুটা দে’!
টেস্টে প্রথম বাংলাদেশি পেসার হিসেবে ৬ উইকেট পেয়েছিলেন। এরপরে বিভিন্ন ক্যাপাসিটিতে বোর্ডে যুক্ত ছিলেন, সর্বশেষ কাজ করেন প্রমীলা দলের সঙ্গে।
ইয়েস, চলে এসেছে ইন্টারমিশনের ক্লাইম্যাক্স!
কয়েকমাস আগে ক্রিকেটার জাহানারা আলম অনলাইনে বোমা বার্স্ট করে, বাংলাদেশ ক্রিকেটে যা অভূতপূর্ব কলংকজনক অধ্যায়। টিম ম্যানেজমেন্টের এক সদস্যের বিরুদ্ধে সেক্সুয়াল হ্যারেজমেন্টের অভিযোগ দেয়, এবং সে কালপ্রিটটি হলো হ্যামিল্টনকে রান আউট করা সেই বাঁহাতি পেসার!
বিরতির পরে ক্যাজুয়াল সিকুয়েন্স, সেখান থেকে এক্সাইটমেন্ট
ওপেনিং বোলার হাসিবুল হোসেন শান্ত প্রথম ওভারেই ব্রেকথ্রু দিয়েছিলেন।
এবার ফ্ল্যাশব্যাক।
আইসিসি ট্রফির সেই কাল্ট ক্লাসিক ফাইনাল, যেখানে ১ বলে ১ রানের সমীকরণ, স্ট্রাইকে শান্ত, লেগ বাই নিয়েই আকাশে ব্যাট তুলে পাগলা দৌড়, দৌড়াচ্ছেন সহ খেলোয়াড়রা, এমনকি বিসিবি প্রেসিডেন্ট সাবের চৌধুরি স্বয়ং- যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাত ৮টার সংবাদে টাইটেল ফুটেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
শান্তর গল্পে আরো একটি লেয়ার হতে পারেন প্রাক্তন পাকিস্তানী প্লেয়ার জহুর এলাহী। ঘরোয়া লীগের এক ম্যাচে তাকে আউট করেছিল শান্ত, তার সেলিব্রেশনে মেজাজ হারিয়ে প্রচন্ড ব্যাট সুইংয়ে তার হাটুতে আঘাত হানে জহুর এলাহির ব্যাট! সে ঘটনা গড়িয়েছিল অনেক দূর। টেস্ট স্ট্যাটাস উত্তর যুগে শান্তকে খুব বেশি ম্যাচে দেখা যায়নি। বিসিবিতে সে যুক্ত ছিল বয়সভিত্তিক দলগুলোর সাথে।
অতি সম্প্রতি আমরা তাকে পেলাম ৪ সদস্যের নির্বাচক প্যানেলে!
এতদূর লিখলাম, খালেদ মাহমুদ সুজন ছাড়া জমে নাকি! একাদশে তিনিও ছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়াতে তিনি এত বেশি আলোচিত, তার প্রসঙ্গে লেখা হয়ে গেছে সবই। ফিল্মে তাকে ব্যবহার করা হবে ডার্ক কমেডি ক্যারেক্টার হিসেবে। তবে কমেডিকে বাংলাদেশীরা সিরিয়াসলি নেয় না। তার ক্যারেক্টারেও কিছু রসদ লাগবে।
বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই আপসেট কীভাবে ভুলি। মুলতান টেস্টটা একদম শেষ মুহূর্তে হেরে যাওয়া, সেও এক মহা ট্রাজেডি। প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে মাঠ থেকে অবসর নেয়া। এর বাইরে ফিল্মে সুজনকে পাওয়া যাবে ২০১৫ বিশ্বকাপ চলাকালীন ক্যাসিনোতে ভাত খাওয়ার গল্পে, ২০১৮ নিদহাস ট্রফিতে নাগিন ড্যান্সে এবং পাপনের বোর্ডের সবচাইতে মুখরোচক ক্যারেক্টার হিসেবে।
ম্যাচটা আমরা জিতেছিলাম মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর ব্রিলিয়ান্ট ব্যাটিংয়ে৷ বিশ্বকাপে সেটাই তার প্রথম ম্যাচ। বিশ্বকাপের প্রাথমিক দলে ঠাঁই হয়নি, মিডিয়ার মাধ্যমে তৈরি জনদাবির মুখে শেষ মুহূর্তে ঢুকে পড়েন। প্রথম ২ ম্যাচে ছিলেন একাদশের বাইরে। ফিফটি করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও, আতহার আলি খান ধারাভাষ্যে থাকলে বলতেন ‘ব্যাক টু ব্যাক ফিফটি’!
বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, এখনকার জেনারেশনের কাছে নান্নু মানেই নির্বাচক, এবং মিডিয়াতে বোকা বোকা কথা বলে নিন্দিত হওয়া। একদিন ফুরোয় তার নির্বাচনী দায়িত্ব, তবে বোর্ড থেকে সরা হয়নি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বর্তমান বোর্ড ভেঙ্গে দিয়ে ৩ মাসের যে আপৎকালীন কমিটি দিয়েছে, নান্নুকে আমরা সেখানেও স্থান পেতে দেখলাম!
ফিল্মের প্লট টুইস্ট এখনো বাকি।
আকরাম খান আউট হন শূন্য রানে। আমার বহু লেখায় উল্লেখ করেছি আইসিসি ট্রফিতে নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬/৪ থেকে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচটা বাংলাদেশ জিতেছিল আকরাম খানের ৬৮ রানে অপরাজিত ইনিংসটির কল্যাণে, এবং সেই ম্যাচেই নিশ্চিত হয় বিশ্বকাপে খেলা৷ নিশ্চিত পরাজয়ের দিকে থাকা সে ম্যাচের রেজাল্ট যদি না বদলাতো, বাংলাদেশের ক্রিকেট তিমিরেই নিমজ্জিত থাকত। বিশ্বকাপের আগে অধিনায়কত্ব হারান। পাকিস্তানের বিপক্ষে জেতা ম্যাচে ছিলেন হাইয়েস্ট স্কোরার।
বিশ্বকাপের পরেও আর ফেরেনি সুদিন। ২০০৩ বিশ্বকাপ দলে জায়গা হয়নি, আসরের মাঝপথে মাশরাফি ইনজুরড হলে রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে চান্স আসে তার। বলে রাখা ভালো, ১৯৯৮ তে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ওয়ানডে জেতার ম্যাচেও ক্যাপ্টেন ছিলেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ান ট্রেভল চ্যাপল কোচ হয়ে আসার পরই তার ফিল্ডিং এবং ফিটনেস নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন, এবং ফ্রেশ ব্লাড রিক্রুট শুরু করতে গিয়ে সিনিয়র ছাঁটাই শুরু করেন, আকরামের ক্যারিয়ারও সেভাবেই সমাপ্ত হয়৷ একসময় সে বিসিবি পরিচালক হয়, দীর্ঘদিন যুক্ত থেকেও সিগনিফিক্যান্ট কোনো কন্ট্রিবিউশন নেই, এখনকার জেনারেশন তাকে চিনে একজন তারকা প্লেয়ারের চাচা হিসেবে, যার কারণে সেই প্লেয়ারটিকে নাকি অন্যায্য সুবিধা দেয়া হত।
let’s begin the ending;
অধিনায়ক ছিলেন বুলবুল। তিনি মারেন গোল্ডেন ডাক। বিশ্বকাপের পরে ক্যাপ্টেন্সিচ্যুত হন। অভিষেক টেস্টের একাদশে জায়গা পাওয়া নিয়ে সংশয় ছিল, সুযোগ পেয়েই সেঞ্চুরি হাকিয়ে ইতিহাস বইয়ে জায়গা করে নেন। তবুও ক্যারিয়ার লম্বা হয়নি তেমন। এরপর যুক্ত হন কোচিংয়ে; চায়না-মালয়েশিয়ার মতো ক্রিকেট অনগ্রসর দেশে কাজ করেন। স্থায়ী হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়।
পাপন যুগে কিছুদিন পরপরই শোনা যেত বুলবুলের মেধা কাজে লাগানো হচ্ছে না। সে আক্ষেপ ঘুচে ইউনুস শাসনামলে। এক দিনের নোটিশে ফারুককে হটিয়ে তাকে বিসিবি প্রেসিডেন্ট বানানো হয়। কী আশ্চর্য, সে ম্যাচেও বুলবুল নেমে যে মাত্র ১ বল টিকলেন, ক্রিজে তার পার্টনার ফারুক আহমেদ!
বলতে থাকেন- ক্ষমতার লোভ নেই, টি২০ ইনিংস খেলে চলে যাবেন। কিছুদিনের মধ্যেই লোভে পড়ে যান, এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচন করেন। তার আমলে বিপিএল এর ম্যাচ বন্ধ হয়েছে, প্রিমিয়ার লীগ বর্জন করেছে ক্লাবগুলো, বিপিএল এ চট্টগ্রাম ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানা কিনেও দল চালাতে পারেনি, বাধ্য হয়ে ফাইন্যান্সিং করেছে বিসিবি, এবং দাঁড়িপাল্লার স্বপ্নপূরণে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলেনি। ইতিহাসের অথর্বতম প্রেসিডেন্ট হিসেবে এ দায় তিনি কীভাবে এড়ান, যে কোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ পদত্যাগ করত, তিনি চেয়ার আকড়ে থেকেছেন।
লীগের পতনে পাপন রিপ্লেসড হয়েছে, ইউনুস সরকার এনেছে প্রথমে ফারুককে, পরে তাকে। ইউনুসের বিদায়ে বিএনপি সরকার নতুন কাউকে আনবে, এতে অন্যরা অভ্যস্ত হলেও বুলবুল আইসিসির ভয় দেখাচ্ছে কাকে যেন। ফারুকের মতো তাকেও স্বল্পতম নোটিশে উৎখাত হতে হয়েছে।
যার মাধ্যমে উৎখাত হলেন তার নাম তামিম ইকবাল খান, চাচা আকরাম খান। কথিত আছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে বুলবুলের বেস্ট ফ্রেন্ডের নামও আকরাম খান!
এমন এক ফিল্ম যেখানে ফিক্সিং, যৌনতা, ক্যাসিনো, হোটেল রোমান্স, দুর্ঘটনাক্রমে মৃত্যু, ১ বলে ১ রানের উত্তেজনা, গ্রেফতার, কারাগার, টকশো, বেঈমানী, লুটতরাজ, ক্ষমতার লোভ, টুইস্ট— সবকিছু উপস্থিত একটা ম্যাচের প্লেয়িং ইলেভেনে! এ ফিল্ম ভাবনা কেন বাংলাদেশি মেকারের এলো না, কে জানে!