ভূখণ্ডের কণ্ঠে অপর্ণা সেন!
ট্রাভেল শব্দটার পরিধি আর বিস্তৃতির সীমা হোয়াংহো নদীর কাছাকাছি হওয়াতে প্রতিদিনকার রুটিন থেকে ভিন্ন গন্তব্যে কয়েক দিন কাটানো বা উদযাপনের কৌশল এবং উদ্দেশ্য যে ব্যক্তিভেদে বিপুলমাত্রায় ভিন্ন হয়ে থাকে সে অনিবার্যতাটা রয়ে যায় অনালোচিত।
‘Stranger Voice Travel’ শব্দটা এতদিন পর্যন্ত এক্সিস্ট করত না। আজ দুপুরে কয়নেজ করলাম। ২০১৪ তে সেমি-প্রফেশনাল ক্রিকেট টিম নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা পরিভ্রমণের যে উদ্যোগ শুরু করেছিলাম, সেই ধারা জারি আছে হোয়াংহোর জলরাশি হয়ে।
আমার এক্টিভিটির নাম কী হওয়া উচিত, এ দোটানার সমাধান হচ্ছিল না সহসা। আমিও ট্রাভেলার, কিন্তু ঘরানাটা না বললে অন্যরা ইন্টারপ্রেট করে পরিব্রাজক হিসেবে।
আমার প্যাটার্নটা Claude এবং Chatgpt এর সাথে শেয়ার করার জন্য প্রম্পট লিখেছিলাম:
আমি অচেনা মানুষের বাসায় থাকি, বিদেশে গেলে থাকি হোস্টেলে, সবরকম লোকাল খাবার খাই৷ রেন্ডমলি কয়েকজন মানুষ বাছাই করে তাদের সাথে গল্প করি। অনেকসময় সেটাও করি না। বিভিন্ন দোকানে বসে স্থানীয়দের ইন্টারেকশন এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ খেয়াল করি। একটা গাড়ি ভাড়া করে জার্নি করতে করতে শহরের ল্যান্ডস্কেপ দেখি। আমার থিওরি হলো ২-৩ দিন অবস্থান করে একটা শহরের বা দেশের কিছুই বুঝতে পারব না৷ যারা বছরের পর বছর এখানে থাকে কিংবা এখানেই জন্মে তাদের চোখে শহর বা দেশটা কেমন, সেরকম কয়েকজনের পারসেপশন সংগ্রহ করলে ক্রসম্যাচিংয়ের মাধ্যমে নিজস্ব পারসেপশন তৈরি হয়। এটা অনলাইন চ্যাটিংয়ে সম্ভব নয়, কারণ অনলাইনে আমি লোকাল খাবার খেতে পারবো না, স্থানীয়দের মিথস্ক্রিয়া দেখতে পারব না, বাতাসের কোয়ালিটি ফিল করতে পারব না, বাড়িঘর দেখা হবে না, সিকিউরিটি বুঝতে পারব না। সাইট সিয়িং প্রায় কিছুই করি না, যদি লোকাল কেউ রেকমেন্ড করে বা নিয়ে যায় সেটা আলাদা ব্যাপার
তাহলে আমি যা করি এ কাজটার নাম কী হওয়া উচিত?
দুই AI যেসব সাজেশন দিল:
-Immersive travel
– Local first travel
-Experiential travel
-Narrative Travel
-Triangulation Travel
-Slow Ethnography travel
-Human-Embassy Travel
কোনোটাই যখন ফিলোসফিকে ধারণে সমর্থ হচ্ছিল না, Claude একটি ইনট্রিগিং প্রশ্ন করে-‘তোমার ট্রাভেলিংয়ের সবচাইতে ইউনিক অংশ কী যার জন্য স্বতন্ত্র নামকরণের প্রয়োজন পড়ছে?’
প্রশ্নটার গভীরে হাঁটতে হাঁটতে অনুধাবন করলাম- আমি যতটুকু কথা বলি, তার চাইতে অনেক বেশি বলি না। যে আমার হোস্ট অথবা গাইড, ৮৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই তারা থাকে বিশুদ্ধ স্ট্রেঞ্জার; ওই অঞ্চলে শরীর স্থাপনের পরই প্রথম দেখা হয় আমাদের; মানু্ষ বা স্থানের যেসব স্যাম্পল সেগুলোর বাছাইতেও থাকে তার ডমিন্যান্স, যদিওবা চাহিদাপত্র জেনারেট করি আমিই৷ ফলে এ প্রক্রিয়ার ইউনিক উপকরণের উপাংশ দুটো
প্রথমত Strangerness, যেখান থেকে গল্পটা শুরু হয়। তার সূত্র ধরে আসে হরেক রকম মানুষ
দ্বিতীয়ত পারসেপশন। কয়েক শ্রেণির বা ইন্টেলিজেন্স হাইটের মানুষের চোখে যখন তার প্লেস এবং স্পেসকে দেখি, তারা হয়ে উঠে সে স্থানের ভয়েস, কিছুক্ষেত্রে আর্কিটেক্ট। সুতরাং Voice আলাদাভাবে ইউনিক ফ্যাক্টর, যা আমার ট্রাভেলিংকে করে বিশেষায়িত।
দুয়ের সমন্বয়েই৷ ‘Stranger Voice Travel’ কয়েন করা।
নেত্রকোণার Stranger ভয়েস থেকে যা যা সংগ্রহ করলাম:
-এক তরুণ যে আমাকে সরাসরি চিনে না, তার সিনিয়র ভাই লিটন দাসকে নিয়ে লেখালিখির কারণে আমাকে অনুসরণ করত। সে অন্য শহরে থাকায় জুনিয়রকে দায়িত্ব দিয়েছে আমাকে রিসিভ করবার। আমি তার মেসে রাত্রিযাপন করলাম। সেই তরুণের কাজিন টিভি সাংবাদিক। গভীর রাতে সে এলো বাইক নিয়ে। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে দেখলাম বাউল গান, মাজার ব্যবসা, খাওয়া হলো দুধ চা, যে দোকান খোলা থাকে ২৪ ঘন্টা। তরুণের পড়াশোনা পছন্দ না, সে চায় স্কিল ডেভেলপ করতে। সাহিত্যপ্রিয় আরো এক তরুণের সঙ্গেও আলাপ হলো। সেও আমায় চেনে ৩য় পক্ষের মাধ্যমে। তার সূত্রে চিনলাম আরেকজনকে যে রাজনীতির পাশাপাশি ফোক গান করে।
– একজন ফিকশন লেখক, যে জনপ্রিয়তা চায়, কিন্তু ধরা দিচ্ছে না এখনো; স্কুলে শিক্ষকতা করছে, সে চাকরিটাও আর উপভোগ্য লাগছে না। তার সূত্রে জানলাম একজনের গল্প যিনি ৯ম গ্রেডের চাকরি ছেড়ে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন; তার সঙ্গে গল্পের ইচ্ছা রয়ে গেল অপূর্ণই।
-গপshop নামের ক্যাফে রেস্টুরেন্ট। গপসপ এর মতো অতি প্রচলিত এক শব্দকে এতটা ব্রিলিয়ান্স দিয়ে রিক্রিয়েট করা যেতে পারে, ভাবতেই চমৎকৃত হয়েছি, যদিও পরের বার নেত্রকোণায় গেলে এ ক্যাফেটার ফসিলও হয়তবা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
-২ বছর আগে রবীন্দ্র সরোবরে যার সঙ্গে সর্বশেষ দেখা, ময়মনসিংহ থেকে সে চলে এসেছে মদনে তার বাড়িতে আতিথ্য দিতে। পারিবারিকভাবে মাছের ব্যবসা তাদের, ফলে চিংড়ি-বোয়াল-ইলিশ-টেংরা-রুই মাছ মিলে ডাইনিং টেবিলকেই রূপান্তরিত করলো মগড়া নদীতে। সে তরুণের সূত্রে কয়েক মিনিটের জন্য দেখা পেলাম একজনের, যার কন্ঠ শুনেই ইনস্টিংট বলছিল গান করে। ওইটুকু সময়েই তার গানের ভিডিও ধারণ করেছি, সারাদিন ছিলাম অভুক্ত, সে আমায় আহার করালো দই-চিড়া!
-এক দেবদারু হৃদয়ের ব্যক্তি, যে শুধুমাত্র আমার জন্য রিজার্ভ করেছে বিশাল ইঞ্জিনচালিত নৌকা; সেই নৌকা আমায় পানি আর পানির শব্দ শুনিয়েছে রাত ১০টা অবধি। আমার জন্য ডাকবাংলোতে রাখা হয়েছিল ভিআইপি কেবিন, আমার দেখভালের জন্য নিয়োজিত ছিল ২ ব্যক্তি। খাওয়া-দাওয়ার জন্য একটামাত্র হোটেল, তারাও কোনো বিল নিল না আমার থেকে। অথচ যিনি এরকম গ্র্যান্ড আতিথ্য দিলেন তার সাথেই হলো না দেখা, অফিসের কাজে আগের দিনই গেছেন পার্শ্ববর্তী জেলায়।
-আবু তালেব নামের ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি, যে ৬ মাস ধানের চাষ করে ৬ মাস বসে থাকে। তার পুত্র ঢাকায় ব্যবসা করে, জলাবদ্ধতার ৬ মাসে সে বাবাকে খরচ পাঠায়। যৌবনে আবু তালেবও গান করতেন, বয়স বাড়ার পরে ঝুঁকেছে ধর্মকর্মের দিকে, সমগ্র খালিয়াজুড়িতে থেকেই উধাও হয়ে গেছে গান। পানির মৌসুমে উড়ো চিঠি আসত ডাকাতের কাছ থেকে, ঘোষণা দিয়েই ডাকাতি করত। রাত জেগে পাহারা দিতে হত। গরু চুরি করে নিয়ে যেত সুনামিগঞ্জের লোকেরা। তারপরে উপযুক্ত মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে হত গরু।
-নাঈম নামের ১৫ বয়সী কিশোর, যে পড়াশোনা ছেড়ে ময়মনসিংহে দোকানদারি করে, বাবার সাথে নৌকায় সময় দেয় পানির সিজনে। সে কখনো চাকরি করবে না, কারণ ঢাকায় বার কয়েক গিয়ে অফিসের বসদের মুখের ভাষার যা নমুনা পেয়েছে, আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে চাকরি অসম্ভব। তার ফেসবুক আইডি, whatsapp সবকিছুই চলমান; তার ফটোগ্রাফি স্কিল অনবদ্য, আরেকটু প্রিভিলেজড পরিবারে জন্ম নিলে সে ফটোগ্রাফির অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে পারত। আমি পেলাম তারই বয়সী আরেক কিশোরকে যার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড শক্তিশালী হওয়াতে ফটোগ্রাফি করে, গান বাজনাও, লোকে তাকে ডাকে সেকেন্ড শাহ!
-মামুন নামের মাঝি যে নিজেই কিছুক্ষণ পরপর আমায় তাগাদা দিচ্ছিল ছবি তুলবার। মোহনগঞ্জে পৌঁছানোর পরে বাইক ঠিক করে দেয়। কিন্তু বাইকের সিরিয়াল ছিল অন্যজনের। এ নিয়ে দুই বাইকারের মধ্যে দীর্ঘ বিতন্ডা। শেষ পর্যন্ত যে বাইকার বিজয়ী হলো তার নাম ফিরোজ। পথিমধ্যে বাইক থামিয়ে সে একটা বাছুরকেও ধাওয়া দিয়ে এলো কিছুক্ষণ!
-মোহনগঞ্জ স্টেশনে এক বৃদ্ধ চাওয়ালা, যে সমগ্র জীবন কাটিয়ে দিয়েছে এ স্টেশনে। এত বড় স্টেশন, অথচ সবগুলো টয়লেট লক করা। অতি নিম্ন মানের এক পাবলিক টয়লেটের বন্দোবস্ত রাখা হয়েছে, যা স্টেশনের রুচির সাথে মিলে না ঠিক।
-মোহনগঞ্জ স্টেশনে বসে ছিলাম সন্ধ্যা ৬টা থেকে। ট্রেন রাত ১১টায়। দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহরকে কাজে লাগাতে চিঠি লিখব স্থির করলাম। শার্লেট সাইলেন্স উপহার দেবার পরে বাংলাদেশী কোনো নারীকেই চিঠি লিখি না, চিঠি চলে যায় slowly apps এর মাধ্যমে বিদেশিনীদের যাদুবাক্সে। ফোনে চার্জ মাত্র ১%; সুতরাং slowly অধ্যায় মুলতবি রাখতে হলো। মনে পড়লো ম্যাগপাইকে। প্রথমবার সাদা আর ক্রিম রঙের পার্থক্য ধরতে পেরেছি তার সূত্রে, সে স্মৃতি সজিব থাকায় ফিল করলাম একটা চিঠি তার প্রাপ্য৷ সমগ্র স্টেশনে মিললো না অফসেট পেপার কিংবা খাতা! নিস্পৃহ ডাহুক হয়ে হেলান দিয়ে বসে আছি স্টেশনে, সময় গেছে ছুটিতে। নয়টার পরে ফোন পেলাম এক তরুণের, স্টেশনে এসেছে৷ তার বাসায় গেলাম, ডিনার সারা হলো হাওড়ের মাছে, ফোনের চার্জ উন্নীত হলো ৩৭% এ; তরুণের বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক জানতে চাইলেন তার পুত্রের সঙ্গে কতদিনের পরিচয় আমার; যখন বললাম ২০ মিনিট আগে প্রথমবার দেখা, কাজী মারুফের অংক মিলে গেলেও তার অংকটা আর মিললো না! জানলাম তরুণ উদ্ভাসে কোচিং করত, ২০১৩ তে উদ্ভাসের ম্যাগাজিন ‘নিরন্তর’ এ কারো একজনের ইন্টারভিউ প্রকাশ করেছিলাম, ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও হিমালয় নামটা প্রাচীন হতে পারেনি
— এই যে এত রকম ভয়েস, তাদের বক্তব্যগুলো একের সঙ্গে অন্যের বহু জায়গাতেই কন্ট্রাডিক্ট করেছে, তবু সবাইকে যখন সমন্বিত করা হয়, ইন্টারপ্রেটেশন হয়ে যায় অপর্ণা সেন। এখানেই ‘Stranger Voice Travel’ এর এক্সিলেন্স!






