‘চল্লিশ’: মোবিল রিফিলিং স্টেশন
গাড়ির চলনে মোবিল এবং ফুয়েল দুই ই দরকারী। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে মোবিল পালটে ফেলতে হয়। নতুন মোবিল মানে ফ্রেশ রিস্টার্ট, যদিও পুরনো মোবিলের অস্তিত্বচিহ্ন রয়ে যায় ইঞ্জিনের শরীরে!
আজ আমি বায়োলজিকালি প্রবেশ করলাম চল্লিশ চক্রে৷ এ বয়সের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় ছিলাম সেই স্কুলের দিনগুলো থেকে। প্রচুর বায়োগ্রাফি পড়ার কারণে ডেসপারেটলি এবং নিশ্চিতলিই জানি এ বয়সটা ট্রান্সফরমেশনের এবং চূড়ান্ত গন্তব্যমুখে পৌঁছানোর প্রথম ধাপ।
৪০ এর মধ্যে যা যা টার্গেট ছিল, একটা বাদে সবই এচিভ করতে পেরেছি। এ প্রক্রিয়ায় আমার নিরন্তর সঙ্গী হয়ে ছিল নি:সীম নি:সঙ্গতা এবং অনিয়ন্ত্রিত একাকীত্ব। ভঙ্গুর মেন্টাল হেলথ আমার পাওয়া মিথিকাল এবং লিরিকাল অভিশাপ!
৪০ হলো সেই মোবিল রিফিলিং স্টেশন । তাই বিগত জীবনের পাওয়া সমস্ত আনন্দ-অনুভূতি ডাম্পিং করে দিলাম। যারা বিশ্বাস ভঙ্গ অথবা আঘাত উপহার দিয়েছে, ক্ষমা করে দিলাম। আমার বাবলে যারা ভ্যালুয়েবল, রিসোর্সফুল এবং ক্যারেক্টার ক্যাটেগরিতে অবস্থান করে, সেই সব মানুষকেও অজস্রবার অপ্রস্তুত এবং আহত করেছি; তাদের থেকেও চেয়ে নিলাম নি:শর্ত ক্ষমা। হার্মলেস (পজিটিভ বা নেগেটিভ কোনোপ্রকার ইমপ্রেসন রাখি না), টক্সিক (যাদের সাহচর্যে মেজাজ হারাই) এবং ভুল মানুষ (যাদের সংস্পর্শ থেকে কোনো ভাবনার উদয় হয় না, উপরন্তু চর্বিত চর্বনে ফুরায় সময়)— এ ৩ ক্যাটেগরিতে থাকা ব্যক্তিদের সাথে ক্ষমা এবং বিস্মৃতির প্রসঙ্গটা হয়ে থাকুক রিসিপ্রোকালি রিডানডেন্ট।
জীবনকে যদি ৫ দিনের টেস্ট ধরি, চতুর্থ দিনের টি-ব্রেক সেসন শেষ করলাম। এখানে আমি বোলিং টিমের প্লেয়ার; ফাস্ট বোলার অথচ ফিল্ডিং পজিশন ফার্স্ট স্লিপে!
৩০ এর পরে যতদিন বেঁচে আছি সবটাই বোনাস লাইফ মনে হয়; তাই শারীরিক অসুস্থতা ব্যতীত কোনোপ্রকার পিছুটান বা শংকা পথ আগলায় না। আমার মনোছবিতে ৫৯ এর পরে এবসোলিউট ব্ল্যাকহোল, ফলে শুরু হলো কাউন্টডাউন; সময় রইলো সর্বোচ্চ ১৯ বছর!
বিগত জীবন থেকে যদি বাছাই করি- সবচাইতে প্রোডাক্টিভ ছিল ২০০৯ সাল, এবং অসহনীয় বাযে, স্থবির এবং নিম্নগামীতার বছর ছিল ২০২৪; আমি যে ব্যক্তিসত্তাটি (চির অবাধ্য, এন্টি পপুলিস্ট এবং স্বাধীনচেতা) ধারণ করতে চেয়েছিলাম তার সূচনা ২০০৩ এ নটরডেমে ভর্তি হওয়ার পরে। তার পূর্বে ছিলাম মায়ের একান্ত অনুগত এবং বাধ্যগত সন্তান। Disown এবং Detachment ফিলোসফিকে ধারণ করা ২০২৩ এর দীর্ঘ ভারত ভ্রমণসূত্রে।
ফলে পুরনো মোবিলের চিহ্ন বলতে ক্যালেন্ডারের এ ৪টি সাল, বাকি ৩৬ কে পার্থক্য করতে পারি না তেমন!
রিকগনিশন আমার প্রায়োরিটি লিস্টে তলানীর দিক থেকে ৩য় বা ৪র্থ পজিশনে অবস্থান করবে। ‘উইটফুল প্লেজার’ এবং কম অনুতাপ-অনুশোচনার জীবন আমার প্রায়োরিটি টপার।
তাই,
হাতে থাকা ১৯ বছরের জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট টার্গেট সেট করেছি; এর একটাও যদি অপূর্ণ থাকে সেটা হবে গাড়ির সেই চাবি, যেটির অনুপস্থিতিতে সবকিছু ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও ইঞ্জিন রয়ে যাবে স্টার্টের অযোগ্য!
টার্গেট১: একটা ‘Decision Intelligence’ স্টার্ট আপ দেয়া, যেটা আমার ভেঞ্চার হওয়া সত্ত্বেও সেখানে নিজের রোল হবে ক্রিয়েটিভ কনসালট্যান্ট। প্রতিষ্ঠিত এবং বড় ব্র্যান্ডের বিজনেস মেকানিজম আলাদা, সেখানে আমার তেমন ভ্যালু এড করার সুযোগ আছে মনে করি না। লোকাল কোম্পানি যাদের ব্রান্ড ভ্যালু নেই, B বা C ক্যাটেগরির ওয়ার্কফোর্স নিয়ে সীমিত বাজেটে বিজনেস অপারেশন চালায়, এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং এখানেই Decision Intelligence মহা ক্রুশিয়াল এবং ক্রিটিকাল ফ্যাক্টর হয়ে উঠে।
টার্গেট২: গ্লোবাল এবং সোশ্যাল মিসফিট মানুষদের নিয়ে Human Resonance Network গড়ে তোলা৷ প্রকল্পের নাম ‘মিসফিট হিজল’; ১০৯ দেশের অন্তত ১ জন ব্যক্তিকে কানেক্ট করা। ইতোমধ্যেই ২৪ দেশ পূরণ হয়ে গেছে, বাকি রইলো ৮৫!
টার্গেট ৩: ঠাকুরকান্দি গ্রামে একটি ‘ক্রিয়েটিভ আশ্রম বা ইকোনমিক জোন’ গড়ে তোলা৷ আশ্রমের মানুষেরা কোনো না কোনো আনকনভেনশনাল প্রক্রিয়ায় জীবিকা নির্বাহ করবে।
টার্গেট৪: সশরীরে ১১টি ভিন্ন দেশের কালচার এবং লাইফস্টাইল এক্সপেরিয়েন্স করা৷ সর্বনিম্ন ব্যাপ্তি ২৫ দিন, সর্বোচ্চ অনির্ধারিত৷ ভারত এবং চায়না সমাপ্ত৷ সর্বশেষ গন্তব্য হবে ইরান এবং মিশর৷ মাঝের ৭টা দেশের সাথে দেখা হোক প্রতি অলটারনেট বছরে। ২৫ দিনের কম কোথাও থাকা হলে, তা ‘মিস্টিক১১’ হিসাবের বাইরে অবস্থান করবে।
টার্গেট৫: বই প্রকাশের আগে দুটো ফিল্ম নির্মাণ করেছিলাম। এমেচার প্রজেক্ট হলেও প্রোডাকশনে পুরোপুরি প্রফেশনাল সেট আপ হায়ার করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ফিল্ম মার্কেট বহুবছর আগেই স্থায়ীভাবে সমাহিত। ফলে ফিল্ম মেকিংকে দিতে পারিনি প্রাপ্য প্যাশন। অন্তত দুটো ফিল্মের এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হিসেবে যুক্ত না থেকে মরলে, সে হবে চরম গ্লানিকর, কারণ ফিল্ম হলো ক্রিয়েটিভিটির সর্বোচ্চ চূড়া যেখানে সাইন্স-আর্টস-কমার্সের নিখুঁত কম্পোজিশনাল এলাইনমেন্ট এবং সেটেলমেন্ট ঘটে থাকে।
টার্গেট৬: বিগত জীবনে ১৮টা বই প্রকাশিত হলেও কোয়ালিটি স্ল্যাবে জায়গা পাবে মাত্র ৭টি। সাবলাইম ৪টি (রঙপ্যাথি, ডিটাচমেন্ট টু ডিপার্চার, সিগনেচার সরণ, হিউম্যান ল্যাব) এবং মডারেট ৩টি (মৌনতা ক্লাব, বীক্ষণ প্রান্ত, নামহীন দামহীন); জীবনের এ ধাপে লেখালিখিতে এনার্জি কিছুটা কমিয়ে দিব। তবু আরো ৭টি সাবলাইম কোয়ালিটির বই লিখতে চাই।
টার্গেট৭: একটি রিলেশনশিপ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করা। জীবনভর বিচিত্র সব মানুষের সাথে মিথস্ক্রিয়া করেছি; সেখান থেকে সম্পর্ক আইডিয়াটা যেভাবে আবিষ্কার এবং ইন্টারপ্রেট করেছি, তার স্থায়ী লেগাসি হতে পারে এ মিউজিয়াম।
টার্গেট ৮: bubble ratio থেমে গেছে ১২৫ এপিসোডে, টার্গেট ছিল ৫০৩; অবশিষ্ট ৩৭৮ এপিসোড পূরণ করতেই হবে।
টার্গেট৯: পৃথিবীর দীর্ঘতম চিঠি ৪০ হাজার শব্দের। হাজার হাজার চিঠি ইমেইল লেখা মানুষের জন্য এ রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলা অতি মামুলি ব্যাপার। চিঠি লিখবার উপযুক্ত ক্যারেক্টার পাচ্ছি না। সবচাইতে কাছাকাছি গিয়েছিল ‘শার্লেট’; she chose silence over resonance; ক্যারেক্টার অডিশন মোড তাই চালু করতে হলো পুনরায়।
টার্গেট১০: দাবা খেলায় প্রচুর সময় দিয়েছি, কেবলমাত্র প্লেজার আহরণই হয়েছে প্রাপ্তি। কন্যা তেইশের দাবার প্রতি ঝোঁক লক্ষণীয়। বয়স এবং মেধা তার অনুকূলে। তাকে গ্রান্ড মাস্টার হতে সবরকম সহায়তা করতে চাই।
টার্গেট১১: আম্মুর বায়োগ্রাফি প্রকাশ করা। আমার প্রতি তার প্রত্যাশা ছিল হিমালয়সম, প্রাপ্তি জুটেছে ছনের ঘর লেভেলের। তবু আমরা পরস্পরের সঙ্গে যে আনকনভেনশনাল বন্ডিং শেয়ার করি, বায়োগ্রাফি হতে পারে তার প্রতি সত্যিকারের ট্রিবিউট। সে পুনর্জন্ম লাভ করেছে কন্যা উনিশের সত্তায়।বয়স তার প্রতিকূলে– ফলে আমার ১১ নম্বর টার্গেট সশরীরে অনুভবের সুযোগ তার মিলবে কিনা সংশয়টা হয়ে রইলো ফ্লোরেন্স নগরী!
মোবিল রিফিলিং সমাপ্ত। এবার ফুয়েল সংগ্রহে অভিনিবিষ্ট হলাম। যারা আমার কল্যাণে ৭ সেকেন্ড হলেও কন্ট্রিবিউট করেছেন প্রত্যেকে ১টা করে চিঠি পাবেন, এটা টার্গেট ১১.১!





