মহাখালি SkS টাওয়ারে ডাবের পুডিং খেলাম আজ৷ তাতে তিনটে স্তর। প্রতিস্তরে স্বাদ আলাদা৷ প্লাস্টিকের চামচে যখন তোলা হচ্ছিল পুডিংয়ের স্লাইস, জিজ্ঞাসা জাগছিল- আমাদের বইগুলো জার্নালিজম আর ফিল্মগুলো কেন ডকুমেন্টারি ধরনের হয় লায়নভাগ সময়?
যা হচ্ছে-ঘটছে সেইসব স্টেরিওটাইপের অবিকল রিফ্লেকশনই যদি পড়তে বা দেখতে হয়, তাহলে লেখক আর ফিল্মমেকারের কাজটা কেরানিগিরির চাইতে আলাদা কি আদৌ?
লেখক এবং মেকারের যদি নিজস্ব লোকাল এবং গ্লোবাল ভিউ না থাকে যা দিয়ে সে রিয়েলিটিকে রিক্রিয়েট করে অথবা দূরবর্তী সম্ভাবনাকেই প্রজেকশন না করে, তার চাইতে সে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি করুক অথবা ওয়ার্ড কমিশনারের বায়োগ্রাফি লিখুক!
যেমন আমাদের ফিল্মগুলোর কমনতম স্টেরিওটাইপ- নায়ক শুরুতে ভোদাই কিসিমের থাকে, দিস্তায় দিস্তায় নাজেহাল হয়৷ এরপর সে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে, মাফিয়া হয়, অফুরন্ত টাকা-ক্ষমতা অর্জন করে। নায়িকার ক্ষেত্রে, শুরুতে থাকে লাজুক এবং যৌনতার ক্ষেত্রে আনকম্প্রোমাইজিং, প্রতিনিয়ত প্রতারিত হতে হতে আর অভাবের তাড়নায় সে শরীরকে পুঁজি বানিয়ে রাজ করে।
এ স্টেরিওটাইপের শেষ কোথায়?
রায়হান রাফি ‘প্রেসার কুকার’ নামে যে ডকুড্রামা (ফিল্ম বলছি না) মার্কেটে রিলিজ দিলেন, তাও প্রেডিক্টিবিলিটি আর অতি রিফ্লেক্টিভ দৃশ্যচিত্রের একঘেয়ে ডিসপ্লে-ই হয়ে থাকলো!
[ ডিসক্লেইমার- স্পয়লার সংক্রান্ত রিজার্ভেশন থাকলে আমার ফিল্ম সংক্রান্ত লেখালিখি এড়িয়ে চলতে সর্বান্তে সতর্ক করছি]
একটা ফিল্ম হৃদপাত করবার ক্ষেত্রে আমি একটা চেকলিস্ট অনুসরণ করি
-স্টোরিলাইন (প্লট, সাবপ্লট, এসেন্স প্রভৃতিতে ব্যতিক্রমীতা বা ভিন্নতা)
-স্টোরিটেলিং টেকনিক
-স্ক্রিনপ্লে (ক্যারেক্টার ডিজাইন, ক্যাচি এবং টাচি সিকুয়েন্স, ডায়লগ, কাস্টিং)
-ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ (ক্যামেরা, লাইট, কালার, ফ্রেমিং)
-আর্ট ডিরেকশন (সেট, লোকেশন, প্রপস, সিম্বল)
-ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক
আমি যেহেতু ফিল্মমেকার নই, আমার এ চেকলিস্টে সংজ্ঞাগত বা স্ট্রাকচারাল ভুল থাকতে পারে। উল্লিখিত ৬ চেকলিস্টের প্রতিটিতে কত রেটিং দিচ্ছি তার ভিত্তিতেই একটা ফিল্ম আমার কাছে প্রাসঙ্গিকতা পায়, অথবা অপ্রাসঙ্গিকতার দিকে ঝুঁকে।
প্রেসার কুকার এ মোট ৫টি চ্যাপ্টার, প্রতিটির নামকরণ রায়হান রাফির পূর্বেকার ফিল্মগুলো অনুসারে। স্টোরিটেলিংয়ের এ ধরনটা সুন্দর। তবে টেনশন বা ক্লাইম্যাক্স মোমেন্টের সংখ্যা অতি নগণ্য হওয়ায় গল্প এগিয়েছে খুবই ধীরলয়ে৷ যে কারণে স্টোরিটেলিংয়ের সৌন্দর্য ফিকে হয়ে গেছে।
ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ, আর্ট ডিরেকশন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক- ৩টি সূচকেই এ ফিল্ম মডারেট টু হাই লেভেল স্কোর পেতে পারে। বেশ কয়েকটা র্যাপ ব্যবহৃত হয়েছে, যা রিফ্রেশিং অনুভূতি দিয়েছে৷ তবে স্টোরিলাইন আর স্ক্রিনপ্লে অতি দুর্বল মানের হওয়াতে ভালো স্কোর পাওয়া ৩ সূচক তেমন ইমপ্যাক্ট রাখতে পারেনি।
ফিল্ম মানে টোটাল কম্পোজিশন, এখানে ভাঙতি ব্রিলিয়ান্স দিয়ে কুল রক্ষা হয় না।
দুটো ক্যারেক্টারকে নোটবুকে রাখতে পারি।
-আজিজুল হাকিম। কর্মচারী ড্রাইভারের অল্পবয়েসি মেয়েকে বিয়ে করতে চায়৷ বাগে পেয়ে কর্মচারী ছেলেকে বিদেশ পাঠানো, গাড়িটা নিজের নামে ট্রান্সফার করে দেয়া, এবং দেনমোহর বাবদ নগদ ২০ লক্ষ টাকা দাবি করে বসে। সে চাইলেই দরদাম করতে পারত ক্ষমতা খাটিয়ে, করেনি৷ স্পা সার্ভিসের নামে যৌনসেবা গ্রহণের যে চর্চা, তার প্রথম সিকুয়েন্সে দেখতে পাই নাজিফা তুষি মাসাজ করতে আগ্রহী, কিন্তু ব্লোজব দিবে না। তখন অন্য একটি মেয়ে আসে, তার চাহিদা পূরণ করে, কিন্তু তুষিকে দিয়ে তখনো ঘাড় মাসাজিং চালাতে থাকে। পার্ভার্টেড ক্যারেক্টারের মধ্যে যে এটিচুডটা থাকে, সেটা পুরোমাত্রাই বিদ্যমান।
-তুষির কলিগ ও বন্ধু, যার বাড়িতে সে আশ্রয় নেয় এবং দেহ বিক্রির হাতেখড়ি হয়, সেই অভিনেত্রীর নাম জানি না। স্ক্রিনে তার জন্য স্পেস বরাদ্দ ছিল না তেমন। তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, এক্সপ্রেসন এতটাই ন্যাচারাল, তাকে উপেক্ষা করা দুরূহ
কেন প্রথম ৩ সূচকে অতি লো-স্কোর তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ফজলুর রহমান বাবুর পুলিশ ক্যারেক্টারটা। তাকে পুশ ইন করার প্রক্রিয়ায় সমগ্র স্ক্রিনপ্লে’র ভরাডুবি ঘটেছে। সে কোনোপ্রকার চার্মই ক্রিয়েট করতে পারেনি। মনে হচ্ছিল একজন স্ক্রিপ্টরাইটার আছেন যার চাকরি প্রতিটি ক্যারেক্টারের দুটো পজিটিভ এবং দুটো ডার্ক সাইড এক্সপোজ করা, বাবু সে নির্দেশনা মেনে অভিনয় চালিয়ে গেছে। একটা ফিল্মের সব ক্যারেক্টার যদি পজিটিভ-নেগেটিভ নিয়ে ডিল করে, সেটা তো সম্পত্তির ওয়ারিশ বন্টনের মতো হয়ে যায়৷ পরিমিতি বোধ থাকবে না?
ফিল্মমেকারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তার সমকালীন সমাজ এবং বৈশ্বিক বাস্তবতা। গ্রেট মেকারমাত্রই সময়কে পিছনে ফেলবার মিশনে থাকেন।
What if মেকারই বরং সময়ের চাইতে পিছিয়ে পড়েন।
উদাহরণ দিই।
বহুবছর পূর্বে শাবানা-চম্পা-সুবর্ণা মোস্তাফা-হুমায়ূন ফরিদিকে নিয়ে শহীদুল ইসলাম খোকন নির্মাণ করেছিলেন ‘পালাবি কোথায়’! প্লট টুকলিফাই করা হলেও সেখানে নারী ক্ষমতায়ন, হ্যারেসমেন্ট এবং ফাইটব্যাকের গল্পটা অনেক বেশি এনগেজিং এবং এন্টারটেইনিং ছিল৷ ৩০ বছর পরে নির্মিত প্রেসার কুকার কি পারলো ‘পালাবি কোথায়’ এর লেভেলে পৌঁছুতে?
আমার উত্তর ‘না’; শেষাংশের সিকুয়েন্স ‘পালাবি কোথায়’ এর সাথে মিলে যায়। সেখানেও ৩ জন মিলে একটি লাশকে জীবিত সাজিয়ে গায়েব করবার চেষ্টা ছিল এখানকার মতো।
ফিল্মমেকারের প্রধান গুণ হবে নৈর্ব্যক্তিকতা বা নির্মোহতা। স্পেসিফিক ক্যারেক্টারের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ক্রিয়েটিভ দেউলিয়াত্ব।
যেমন,
নাজিফা তুষির ক্যারেক্টারটা একদম অকারণে এটেনশন পেয়েছে৷ আমরা এসব ক্যারেক্টার দেখে দেখে চশমা ব্যবহারের বয়স ২ যুগ পাড় করেছি৷ তাদের গল্পেও নেই কোনো বয়ানের পুনর্বয়ান৷
স্নিগ্ধা চৌধুরি আর বুবলির ক্যারেক্টারে বরং অনেকগুলো দিক লুকায়িত ছিল, যেখানে এক্সপ্লোর করা যেত। তারা কেন হয়ে রইলো নিছকই শখের ক্যারেক্টার!
স্নিগ্ধাকে পাই ফেসবুকে লাইভ করছে গুলশান-বনানীর পশ কিড হয়ে, সারা বছর ইউরোপ আমেরিকায় ঘুরাঘুরি করে, লাইভের ৩০ হাজার ভিউ আর শত শত কমেন্ট, অথচ মোহাম্মদপুরের অতি সাধারণ ঘরের এক মেয়ে সে। ডিজিটাল পৃথিবীতে ক্যারেক্টার ফেকিংয়ের যে ক্রাইসিস, এ চ্যাপ্টারগুলো নিয়ে হরেক ধাচের গল্প বলা সম্ভব। স্নিগ্ধা আটকে গেল আবাসিক হোটেলে৷
বুবলি শিক্ষিত, স্বামীর কাছে ডমেস্টিক ভায়োলন্সের শিকার হওয়ার মধ্যেও তার যৌন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে। একইসঙ্গে লিপ্ত, প্রেমিকের সঙ্গে মিলে স্বামীকে হত্যার চক্রান্ত করে, ৩য় পক্ষ কাজটা করে দেয়ায় স্বামীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পেয়ে যখন ক্ষমতার স্পর্শ পায়, পরকীয়া প্রেমিককে আর ভালো লাগে না, প্রেমিক যখন নিজেদের ইন্টিমেট ভিডিও লিক করবার হুমকি দেয়, তাকে গুপ্তহত্যা করায়৷ তার এন্ট্রি সিনে স্বামী মিশা সওদাগরের ওল্ডস্কুল রাজনীতির কারণে সমালোচনা করতে দেখি, মিশা অপমানিত হয়ে তাকে মারধর করে। মিশা প্রতিপক্ষকে খুনের চিন্তা করলে সে বাধা দেয়৷ ক্ষমতার নাগাল পেয়ে সেও খুনেরই ফরমায়েশ দিতে থাকে৷ আমাদের ফিল্মে নারীর এ দিকটি আসে না সচরাচর। কিন্তু বুবলি পায়নি প্রয়োজনীয় এটেনশন, পেয়েছে নিজ কর্মচারীর বেঈমানীবশত ছোড়া বুলেটের মৃত্যু!
রায়হান রাফি এ ফিল্মটা কেন নির্মাণ করলেন, দর্শকই বা কোন পয়েন্ট থেকে দেখবার জন্য ট্রিগারড হচ্ছে। যদিওবা বলা হচ্ছে ঢাকা শহরটা মেয়েদের জন্য প্রেসার কুকার, এ কথনটার উপস্থাপন তা বলে না।
ফিল্ম শেষে আমি এভাবে ইন্টারপ্রেট করেছি- ‘প্রেসার কুকারে মাংস রান্না করা হয়। নারীদেহ মূলত মাংস, পুরুষেরা তা ভক্ষণের জন্য ঘুরঘুর করে’—- এ ইন্টারপ্রেটেশনেই বা ইউনিকনেস কোথায়!
রাফির সর্বশেষ প্রজেক্ট ‘তান্ডব’ ছিল ডাইজেস্টার, তুফানের থেকে যোজন মাইল পিছানো। কাপড়ের দোকানগুলো সারা বছরের ব্যবসা করে দুই ঈদে৷ ফিল্মের ক্ষেত্রেও সিনারিও দাঁড়িয়েছে একই। প্রতি ঈদেই প্রেজেন্স নিশ্চিত করতে হবে, তাই একটা কিছু নামিয়ে ফেলো।
আমাদের ফিল্মমেকাররা কেন ডাবের পুডিং খায় না, বলো তো শার্লেট!