জীবনিভিত্তিক বইয়ের ক্ষেত্রে আমরা যে একটা গৎবাঁধা ফর্মুলায় আটকে পড়েছি, সেখান থেকে উত্তরণের উপায় কি আছে আদৌ?
প্রথমত, কাদের জীবনি হয়?
কবি-সাহিত্যিক-চিত্রকর-বিনোদন তারকা অথবা সফল ব্যবসায়ী কিংবা রাজনীতিবিদ। কিন্তু আমি যদি একজন চিকিৎসক বা পুলিশের জীবনি পড়তে চাই, বাংলা বা যে কোনো ভাষা মিলিয়ে এ সংক্রান্ত কাজ পাওয়া যাবে কয়টা? অথচ কন্ট্রিবিউশন বা ইমপ্যাক্ট স্কেলে কবি-সাহিত্যিক বা বিনোদন তারকার চাইতে ডাক্তার বা পুলিশ কি উপরের দিকে থাকার কথা নয়?
শিল্প-সাহিত্য তীব্রভাবে একান্ত ব্যক্তিগত এবং শ্রেণিনির্ভর কনসেপ্ট। বিরল ব্যতিক্রম বাদে কতিপয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আর শৌখিন উচ্চবিত্তের মধ্যেই যার অনুশীলন এবং সঞ্চালন সীমাবদ্ধ৷
কিন্তু ডাক্তার বা পুলিশ শ্রেণিনিরপেক্ষ পেশা। তাদের ম্যাচিউরিটি জীবনিতে স্থান পাওয়া ব্যক্তিবর্গের চাইতে বেশি। ম্যাচিউরিটি আসে মূলত বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর এক্সপ্লোরিং মানসিকতার সমন্বয়ে। এ দুটো যার মধ্যে অনুপস্থিত তার বয়স ২৩ হলে কি ৫৩ তেই বা কী। কিন্তু আমরা ধরেই নিই ম্যাচিউরিটি সরাসরি জৈবিক বয়সের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
তাই সোসিও কালচারাল এবং এনথ্রোপলজিকাল গ্রাউন্ডে, চিকিৎসক এবং পুলিশের জীবনি অন্য যে কোনো ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষের চাইতে অধিক তাৎপর্যপূর্ণতার দাবিদার।
কিন্তু সেই দাবি পূরণ করবে কে? একজন চিকিৎসক বা পুলিশ কি ডিউটি থেকে অব্যাহতি নিয়ে পুরোদস্তুর লেখক হয়ে উঠবে? সেটা তো এবসার্ড চিন্তা!
বরং কৌতূহলী প্রকৃতির এবং প্রবৃত্তির মানুষ যারা লিখতে জানে এবং সময় বরাদ্দ রাখতে পারে, তারা এরকম এক বা একাধিক ব্যক্তির জীবনি নিয়ে কাজ করতেই পারে।
দ্বিতীয়ত, জীবনি কনসেপ্টের অচলাবস্থা। আমাদের জীবনিগুলো আদতে ইনফোগ্রাফি হয়ে যায়৷ ইনফরমেশনে ঠাঁসা। কবি কায়কোবাদ কত সালে কোন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন, জন্মের সময় তার পিতার পরনে কোন রঙের পোশাক ছিল এসব ইনফরমেশন বয়ানেই খরচ হয়ে যাবে দিস্তা দিস্তা পৃষ্ঠা। এতে ব্যক্তির গ্লোরিফিকেশন এবং নার্সিসিজমের পুনর্বাসন ব্যতিরেকে তেমন বৃহৎ কোনো পারপাজ পূরণ হয় না আদতে।
জীবনির লক্ষ্য হওয়া উচিত ডিসকভার, যেটা আসবে রিকনস্ট্রাক্টশন আর ডিকনস্ট্রাক্টশন এর আনুপাতিক সহাবস্থানে৷ সেখানে থাকবে ক্রিটিক, এনালাইসিস, এক্সপ্লোর, এজাম্পশন। সেই ব্যক্তির জীবনটা যাপন করতে হবে। অনেকটা মেথড এক্টিংয়ের মতো। জনশ্রুতি আছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পদ্মানদীর মাঝি লিখেছিলেন তার পূর্বে একটা লম্বা সময় জেলে পাড়ায় কাটিয়েছিলেন। আমি মনে করি এটা যতটা কনটেন্ট সংগ্রহ, তার চাইতে বেশি কালচারটার সাথে একীভূত হওয়া। কিংবা মিডিয়া মারফত এটাও জেনেছি, মনের মানুষ সিনেমায় লালন চরিত্রে অভিনয়ের পূর্বে প্রসেনজিত টানা অনেকদিন মাটির বিছানায় শোয়ার অনুশীলন করেছিলেন।
তাই ইনফোগ্রাফির বদলে জীবনি হওয়া উচিত আদতে রেডিওগ্রাফি, যেখানে স্থান পাবে ইমপ্যাক্ট, ইনফ্লুয়েন্স, সিগনিফিক্যান্স, বা কনফ্লিক্টচুয়াল বা কনটেক্সটচুয়াল এনালাইসিস।
কাজটা প্রচণ্ড শ্রমসাধ্য, সময়সাপেক্ষ এবং আম্পায়ারিংয়ের মতো থ্যাংকলেস, যেখানে রিওয়ার্ড নেই তেমন, তবে নিন্দিত হওয়ার রিস্ক থাকে ব্যাপকমাত্রায়।
এর চাইতে ইনফোগ্রাফি লেখা বা স্তুতিকাব্য রচনা অনেক নিরাপদ, এবং অল্প বিনিয়োগে অধিক মুনাফার হাতছানি।
ধরা যাক, কেউ একজন মাইকেল মধুসূদন বা প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এর চিন্তাগ্রাফি লিখতে চাইলো। মধুসূদনের প্রতি পূর্ণ সমর্পিত না হওয়া পর্যন্ত এটাচমেন্টটাই তৈরি হবে না। ফলে সে তখন ১০-২০ টা বই পড়বে যেগুলো মধুসূদনকে উপজীব্য করে লেখা হয়েছে, এবং তার লেখাটাও সেসবের পুনরাবৃত্তিমূলক পুনরাৎপাদন হবে মাত্র।
আরেকটা বড়ো সমস্যা জীবনি লেখার টাইমলাইন নির্বাচন। বয়স ৬০-৭০ হয়ে গেলে বা মৃত্যুর পরে জীবনি লেখার উপযুক্ত হয়ে উঠে একজন মানুষ, অথচ এটাও একটা বিভ্রান্তি। মৃত মানুষের ব্যবচ্ছেদ করে তাকে হিরো বা ভিলেইন বানিয়ে আদতে একটি মিথিকাল চরিত্র তৈরির প্লাটফরম গড়ে তোলা হয়। কালক্রমে এদেরই কেউ হয় জিউস, কেউবা ইন্দ্র। কিন্তু জীবদ্দশায় এবং ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে কারো চিন্তাগ্রাফি লিখলে দুটো উদ্দেশ্য পূরণ হয়৷ প্রথমত এটা তার কর্মভাবনাকে রিভিউ করতে সহায়ক হয়। দ্বিতীয়ত, সমকালীন সমাজে টকিং তৈরি হয় যার প্রভাব পড়ে সার্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাপিটালে।
চিন্তাগ্রাফি নিয়ে এত সুদীর্ঘ ভাবনার মূল কারণ আমার ১২তম বইটি হতে যাচ্ছে একজন চিকিৎসকের চিন্তাগ্রাফি। তিনি জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধ কোনো মানুষ নন, অর্থাৎ নাম বললেই চিনে ফেলার পজিশনে পৌঁছাননি। তার কর্মজীবন নিয়ে ২০-২৫ টা রেফারেন্স বই কোথাও পাওয়া যায় না। ফলে তার দার্শনিকতা প্রায় পুরোটাই আবিষ্কার করে নিতে হচ্ছে নিজের প্রচেষ্টায়।
আমাদের সমাজে নিন্দিততম পেশাজীবীর তালিকা করলে পুলিশ আর চিকিৎসকই শীর্ষে থাকবে। যে কারণে আরো ৩-৪ বছর পূর্বেই এই দুই পেশাজীবীকে নিয়ে এনালাইসিস লিখেছিলাম, সেসময় এই দুই পেশার অসংখ্য মানুষের সাথেই সংলাপ বিনিময়ের সুযোগ ঘটেছিল। চিন্তাগ্রাফি লিখবার পরিকল্পনার জন্ম হয়নি তখনো। সেরকম বলিষ্ঠ কোনো ক্যারেক্টার না পাওয়াটাও একটা ফ্যাক্টর হতে পারে।
গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে যখন চিন্তাগ্রাফি প্রকল্প শুরু করলাম তারপর থেকেই অনেক মানুষকে নতুন আঙ্গিকে দেখতে শুরু করলাম, ফিল্টারে যুক্ত হলো নতুন উপকরণ। সেই পরিক্রমাতেই চলে আসেন একজন চিকিৎসক। বই প্রকাশ না হওয়া অবধি তার ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যেতে চাচ্ছি না। কারণ এমন হতেই পারে প্রচুর মেহনত, ত্যাগ, তিতিক্ষা আর নির্ঘুমতার পরেও বইটি আর আলোয় এলো না; প্রত্যাশা তৈরি করে তখন তা ভঙ্গের বেদনা বাড়াবে। আমার ৫-৭ টা বই ই তো অনেকদূর হেঁটেও পায়নি গন্তব্যের দেখা! চিকিৎসকের চিন্তাগ্রাফিটার অন্তিম পরিণতি ইতিবাচক হওয়া সামাজিক উৎকর্ষের বিচারেই জরুরী।
আমরা নীটশের জরাথ্রুষ্ট বললেন বইটা পড়ি, প্লেটোর বয়ানে চিনেছি সক্রেটিসকে, কিংবা আহমদ ছফার কলমে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাককে চিনেছি জ্ঞানতাপস রূপে। রোগ নিরাময়ে ভূমিকার বাইরেও চিকিৎসকদের প্রচণ্ড জোরালো যে অবদান থাকে একক ও সামষ্টিক মনোজাগতিক অগ্রগমনে, সেই দিকটি এখনো অব্দি অনুল্লেখিতই রয়ে গেছে। চিকিৎসকদের হার্ডকোর ভাবলেশহীন পেশাজীবির বাইরে অন্য কিছুতে দেখিনি আমরা৷ কিংবা শর্টকাটে মহত্ত্বের প্রদর্শনীস্বরূপ বিনামূল্যে চিকিৎসা!
এতে কি আদৌ মিনিংফুল কোনো ইমপ্যাক্ট তৈরি হয়?
এইসব অনুচ্চারিত আলাপের হাইপোথিসিস তৈরিতে আমার প্রয়োজন ছিল একটি স্যাম্পল বা একজন মডেল যিনি চিকিৎসকদের প্রতিনিধি না হয়েও প্রতিনিধিত্ব করেন তার ব্যক্তিসত্তার। এ লক্ষ্যে গত ৫ বছরে প্রায় ১০-১২ জন চিকিৎসকের সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা চালিয়েছি সচেতন বা অবচেতনে। মনে পড়ে ২০১৮ এর প্রায় পুরোটা কেটেছে পিজি হাসপাতালের এক চিকিৎসকের ইন্টারভিউ নেয়ার প্রচেষ্টায়, শেষ পর্যন্ত আর সময়ই দেননি। তাই ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের সাথেই, তাদের সবাই আবার ক্যারেক্টার বা মডেল হবার পটেনশিয়ালিটি রাখেন না। এরপর কীভাবে পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত ক্যারেক্টার সে এক মেঝ বিশাল ইতিহাস, যা জড়ো করলে রূপান্তরিত হবে স্বতন্ত্র বইতে!
হিউম্যান মোটিভ আমার মৌলিক আগ্রহের জায়গা। জীবন্ত মানুষকে ভিত্তি ধরে থিসিস লেখার যে সিসিফাসিয় কর্মযজ্ঞে নিযুক্ত হলাম, বইটা শেষ পর্যন্ত লিখতে পারলে হয়তবা ব্যতিক্রমী কোনো ক্রিয়েশন পেলেও পেতে পারে চিন্তাশীল জনগোষ্ঠী।
প্রকৃতি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকুক! আমার নিজেরও আয়োডিন লেভেল গণ্ডগোলমুক্ত রাখার সংকল্প সমুন্নত রাখা জরুরী, কারণ এবসার্ডিটি লুপে পড়ে জীবনে বহু মূল্যবান কর্মই চিরতরে হারিয়ে গেছে কৃষ্ণগহবরে!
এ ব্যাপারে বীক্ষণ প্রান্ত বইয়ের ষৎকো নামের পিঁপড়াটা ভেঙচি কেটে বলে- ‘নচল্লা বন্ধ কইরা কোয়ালিটি কাজ কর, ভাবের আলাপে সিদ্ধি মিলবে না; যত্তসব!’