পেশাদার পরিব্রাজক

খবর এটা মোটেই না যে, আমার নামহীন বইয়ের স্টক প্রায় শেষ এবং উপন্যাস প্রকাশন এর সাথে বইয়ের পুনর্মুদ্রণের ব্যাপারে আজ চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে। খবর হলো, আজ একজন পেশাদার পরিব্রাজককে নিয়োগ দিয়েছি যে ডিসেম্বরের ২য় সপ্তাহে ঠাকুরগাঁওয়ে যাবে ২ সপ্তাহের জন্য, ঘোরা শেষে ঢাকায় ফিরে ঠাকুরগাঁওয়ে ভ্রমণকৃত অঞ্চলটি নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখে জমা দিবে।

পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর গল্প পড়েছি সমাজ বইতে, ইবনে বতুতা রীতিমতো সেলিব্রিটি আধুনিক যুগের পাঠক সমাজে। এখনকার সময়ে পরিব্রাজক হয় না মানুষ, পর্যটক হয়।

২০১৬ থেকেই একটা প্ল্যান ঘুরছিলো মাথায়। ঢাকা থেকে একজন রেন্ডম মানুষকে নির্বাচন করে বাসে চড়ে ঠাকুরগাঁও যাবো, পৌঁছে একটা ভ্যান ভাড়া করে ঘুরতে ঘুরতে তার ইন্টারভিউ নিবো, ইন্টারভিউ শেষে স্থানীয় সস্তাদরের হোটেলে ছোট মাছ দিয়ে ভাত খেয়ে ফিরতি বাসে ঢাকা ফেরত আসবো। কিন্তু ২০১৬ এর শেষ থেকেই একের পর এক বিপর্যয়ে পরিকল্পনাটা বাস্তবায়িত হচ্ছিলো না।

ছোটবেলায় বাংলাদেশের জেলাগুলোর নাম পড়তে গিয়ে একটা নামে দৃষ্টি আটকে যায়- ঠাকুরগাঁও। একটা জেলার নামের শেষে গ্রাম থাকবে কেন, এটা কেমনতর জেলা!সেই প্রশ্ন থেকেই ঠাকুরগাঁও আমার অবসেসন হয়ে উঠে, আমার লেখায় কোনো স্থানের নাম উল্লেখ করলে সেখানে ঠাকুরগাঁও নামটা থাকবেই।
বস্তুজগতের প্রতি চরম বিবমিষা থেকে ২০১৫ তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ঠাকুরগাঁয়ের প্রত্যন্ত গ্রামে চলে যাবো, যেখানে ইলেকট্রিসিটি নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করে না, ভারি কোনো যান চলাচল করে না, পাকা রাস্তা নেই। সেখানে ২ বছর মুষ্টিভিক্ষা করে জীবন ধারণ করবো। ২ বছর পরে বস্তুজগতে প্রত্যাবর্তন করবো ফ্রেশ মাথা নিয়ে।

কিন্তু মায়া-মোহ আর সাহসের অভাবে এখনো সেই উদ্যোগ শুরু করতে পারিনি, তবু ঠাকুরগাঁওয়ের ঘোর থেকে মুক্ত হতে পারি না।

আমার জীবনের প্রথম বই প্রযত্নে-হন্তা এর ৮ম গল্প ‘গ,ল,হ; তবু গলগ্রহ’; এই গল্পে ৩৭ বছর বয়সী এক লোক নিজের নাম রাখে মাধুকর দা। সাংসারিক জীবনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে সে ২ বছরের জন্য বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য ৭৩১ জন পরিচিত মানুষের তালিকা করে। প্রত্যকের বাসায় একদিন করে যাবে, তাদের সাথে আড্ডা মারবে, সেখান থেকে আরেকজনের বাসার উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে উক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে যাতায়াত ভাড়া সংগ্রহ করবে। ৭৩১ তম ব্যক্তির বাসা ভ্রমণ শেষে সে ঘরে ফিরে আসবে। গল্পটা লিখেছিলাম ২০০৯ এ, তার মানে প্রায় ১০ বছর আগে আমি মাধুকর জীবনের একটি গেমপ্ল্যান বানিয়েছিলাম।

কমফোর্ট জোন ঠাকুরগাঁয়ে যেতে দিচ্ছে না, ৭৩১ জন মানুষের তালিকাও করা হচ্ছে না; জীবন কি কেবল বই লেখালিখি আর মানুষের গল্প শোনার মধ্য দিয়েই কেটে যাবে?

আজ উপন্যাস প্রকাশন থেকে ২ জন তরুণ আসে বাসায়, তাদের একজন ১৫০ কিঃমিঃ পথ সাইক্লিং করেও ক্লান্ত হয় না, শীতকাল কাটায় বান্দরবানে, তার গল্প শুনে মুহূর্তের মধ্যেই ঠাকুরগাঁও অবসেসন সতেজ হয়ে উঠে। আমি বোধ করি, একজন পেশাদার পরিব্রাজক পেলে সে তার অভিজ্ঞতার গল্প বলবে, সেটা শুনে আমি নিজের ভেতর ধারণের চেষ্টা করবো। এটা আমাকে শারীরিকভাবে না হলেও আত্মিকভাবে ঠাকুরগাঁয়ে নিয়ে যাবে। চেহারা ধার নেয়া আমার পুরনো অভ্যাস। নামহীন বইয়ের মূল চরিত্র ৩১৭৯ এর চেহারা ধার নিয়েছি এমন একজন নারীর কাছ থেকে যার সাথে বাস্তবজীবনে কোনোদিন কোথাও দেখাই হয়নি। পেশাদার পরিব্রাজকসূত্রে এবার শরীর ধার নেয়ার পালা। সশরীরে না পারলেও আমার হয়ে আরেকজন ঘুরবে, আমি সেটা ধার নিবো।

তরুণের নাম রাহাত বিন হাশেম। আমি বললাম, রাহাত নামটা পরিব্রাজকের সাথে যাচ্ছে না। শ, জ, দ প্রভৃতি বর্ণগুলো দিয়ে নাম শুরু হলে সেটা জাদরেল লাগে। যেমন ধরো, শমসের, জাহাঙ্গীর, মোজাম্মেল। সে বলে, ভাই আপনি একটা নাম দিয়ে দেন, আমারও মনে হচ্ছে রাহাত নামটা হালকা হয়ে যাচ্ছে।
ভেবে নাম মাথায় আসছে মোকাব্বের আল জামিল। এইবার পরিব্রাজক ভাব আসছে৷

মোকাব্বের আল জামিল ঠাকুরগাঁও ভ্রমণে আমার তরফ থেকে পাচ্ছে ২৩০০ টাকা, থাকতে হবে কমপক্ষে ১৩ দিন। টাকা শেষ না হওয়া অবধি ঢাকায় ফেরত আসা যাবে না।

আমার সপ্তম বইয়ের বিষয় শব্দগত ইন্টারপ্রেটেশনের অভিধান। এটা নিবেদন করা হবে সঞ্চিতা দে কে। বইয়ের প্রচ্ছদ করার দায়িত্ব দিয়েছি মোকাব্বের আল জামিলকে, যদিও জানি না সেই বই কবে প্রকাশিত হবে। ৬ষ্ঠ বই শুরু করলাম মাত্র।

আরো কয়েকটা জেলা বা অঞ্চলের নাম ফ্যাসিনেট করে আমায়৷ নীলফামারী, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, সন্দ্বীপ, ঝালকাঠি, চন্দ্রঘোনা, ঘোড়াশাল। কালক্রমে সেসব স্থানেও মোদাব্বের আল জামিলের পদচিহ্ন পড়বে হয়তোবা। তবে হিউম্যানল্যাব নিয়ে প্রচণ্ড অর্থকষ্টে দিন কাটছে। এর মধ্যেও পেশাদার পরিব্রাজক পালন অতিরিক্ত পাগলামি মনে হতেই পারে। হলে হোক, তাতে আমার কী!

Share your vote!


Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid